thaba.in

বৈশাখী নার্গিসের মুক্ত গদ্য

শেয়ার করুন

নিটোল দুপুরের ঘ্রাণ

চারদিকে যখন আমের মুকুলের মাতাল করা গন্ধ থইথই করছে, আমি আর পাঁচজনের মতো হাতড়ে ফিরছি পরীক্ষা শেষের দিন। নড়বড়ে একটা ভিত গড়তে গিয়ে বুঝে নিচ্ছি আগামীর চাল-ডাল, নুন-সব্জি। সিমেন্টে বাঁধানো রাস্তায় মাটির ঘ্রাণ কই আর। তবু শহুরে ঘাম গায়ে মেখে অন্তরঙ্গ হচ্ছি নিজের সাথেই। বিজ্ঞাপনের শহরে কবেই একজন বলে গিয়েছেন, বিজ্ঞাপনে ঢেকে যায় মুখ। যতটুকু আকাশ দেখি বা দেখতে পাই ঝাপসা নীল রঙ কেমন করে যেন মন খারাপের রঙ হয়ে যায়। দুপুরবেলা ভাতঘুমের পর যেমন লাগে, সেরকম তেতো। 

এগারটা বাজার আগেই এক এক করে আসে সব্জিওয়ালা।  তার টানা টানা সুর দিয়ে দিনগুলো মুড়ে রেখে যায়। আমি ভাবতে গিয়েও হোঁচট খাই। এক বেহালাবাদকের কথা মনে পড়লে, বহু টালবাহানার পর গানের সুর ভাবি। গুনগুন করি মনি পিসির পাশে বসে। দুপুরের রোদ মিইয়ে এলে কাঁচামিঠে আম নিয়ে আসে ও পাড়ার দস্যি মেয়ে লতিকা।  দূর দূরান্তে ছড়িয়ে পড়ে সবুজ আলো। এসব দিনে ফিরতে চাইলেও ফেরা যায় না। 

জেন জি’দের মতো ভাবতে গেলে হারিয়ে যায় অনুভব। কথা বলার অগাধ আস্থা নিয়ে আমিও যে উত্তাল মিছিলে শামিল হতে পারি, সেদিনই বুঝেছিল পলাশ। এ পলাশ আগুনের মতো জ্বলে উঠত নকশালি দিনে। আমি ফিনফিনে গোলাপি রঙের আঙুলে গুনতে শিখলাম যেদিন, সেদিন সে’ও উড়াল দিল। বলল, পাখি হবে সে, আগুন পাখি। 

দগদগে স্বপ্ন নিয়ে দুপুরের মায়া গুলো ফিরে আসে। বইমেলার মাঠ, ধূ ধূ প্রান্তর, সাহসী মানুষ, বাতাবি লেবুর ঘ্রাণ যেন ছুঁয়ে যায় পরপর। আর সে ছুঁয়ে যাওয়ার মধ্যে থাকে অবাক করা কিছু কথা। পাগলের প্রলাপ…

ওই যেমন শিল-বাটায় জিরে বাটার আওয়াজ, তারপর মাছ স্যাঁতলানোর সেই ছ্যাত করে ওঠা। হালকা পাতলা ঝোলের মতো জীবন এক বল্গাহীন শরীর শুধু। 

টুক করে বইয়ের পাতায় মন দিতে চাইলেও, প্রেম কেবল মুচকি হাসে। ঘ্রাণে উঠে আসে দিদার বলে যাওয়া হাতম্বল নামের এক হারিয়ে যাওয়া রান্নার কথা। ফ্যাসফ্যাসে গলায় সেদিন বলেছিল তিল বাটা আর লেবু চিনি দিয়ে বানানো ছোটো কাঁসার বাটিতে ভরা সেই অমৃতের স্বাদ। 

ফিরব বললেই কি আর ফেরা যায়। বাউল বাতাসে বসন্তের ডাক কচি হয়েই আসে। প্রথম বৃষ্টির পর তার চাহনি উদাসী যাদুকরের আখড়া, আবার ভাসিয়ে নিয়ে যাবে ঠিক। ততক্ষণে আরও বেশি করে জীবন আমের গন্ধে মেতে উঠুক। পুবের চাঁদ নিয়ে আসুক আস্তিক ভিটে মাটির রসদ।

বৈশাখী নার্গিস

কবিতা কখনও শখ নয়, এ এক জন্ম। প্রতিটা কবিতায় মুহুর্ত নিয়ে বেঁচে থাকার লড়াই। শব্দের শরীরে হু হু করে হাওয়া বাতাস চলাচল না করলে, এই আমি মৃত আত্মা।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top