শুভঙ্কর দাশ, গ্রাফিত্তি এবং আমি
শুভদা ফোন করে বলেছিল – শোন, একটা সংখ্যা করছি গ্রাফিত্তি নিয়ে। মানে যারা যারা গ্রাফিত্তির সাথে মিশেছে, গ্রাফিত্তিতে লিখেছে, মানে একটা ধারণা আছে গ্রাফিত্তি সম্পর্কে, তাদের কয়েকজনকে বলছি লিখতে। তুই একটা লেখা লেখ।
সেই লেখা শেষ করে পাঠালাম। সংখ্যাটা আর হল না। শুভদা চলে গেল, তার আগেই। অসম্পূর্ণ থেকে গেল তার ইয়োরোপের ডায়েরিও, ভাষায় ও অনুভবে সে এক অনবদ্য লেখা।
শুভঙ্কর দাশ নিঃসন্দেহে আমার অন্যতম প্রিয় কবি। আমি অবশ্য খুব বেশি সংখ্যক কবির কবিতা ধারাবাহিক ভাবে পড়ে উঠতে পারিনি, তাই, জীবনানন্দ পরবর্তী প্রিয় কবির তালিকা জনা দশেকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ।
এত মায়ায় ভরা কবিতা খুব কম পড়েছি, যেমনটা শুভদার কবিতা। পড়তে পড়তে ঘোর লেগে যায় কেমন! কী আশ্চর্য সহজ ও সাবলীল ভাবে শুভদা বলে দিয়েছে গূঢ়-গভীর কথা, জীবনের, খানিকটা যেন মজার ছলেই!
‘ফক্কড়নামা’, তার শেষতম সংকলন থেকেঃ
জন্ম
জন্ম একটা ব্যাপার বটে।
জড়িয়ে মড়িয়ে
ভালবাসায় কাটিয়ে ফেলা
কিছুটা পল অনুপল।
থাকলে আছে না থাকলে নেই।
কবিতা আর জীবন এত মিলেমিশে গেছে এমন কবি বিরল। শুভঙ্কর দাশ এমনই এক বিরল মানুষ, আমার দেখা। স্রেফ লেখার মজায় মজে থেকে, প্রতিষ্ঠা ও প্রতিষ্ঠানকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে, জীবনের প্রতিটা মুহূর্তকে ভালবেসে, উপভোগ করে চলে গেল, মায়া কাটিয়ে!
এবার, শুভদাকে শেষবারের মতো পাঠানো, গ্রাফিত্তি নিয়ে আমার সেই লেখাটার কিছু অংশ তুলে দিচ্ছিঃ
কিছুটা কালো স্পর্শ করে যান
শিরোনামের কথাটাই লেখা ছিল স্টলের বাইরের দেওয়ালে। যদি খুব ভুল না করি। ২০০২ সাল। কলকাতা বইমেলা। আমরাই শেষ প্রজন্ম যারা ময়দানের ধুলোয় বই-পত্তরের গন্ধ শুঁকেছিলাম। সে যাইহোক, গোঁত্তা খাওয়া ঘুড়ির মতো আমি ঢুকে পড়েছিলাম স্টলটায়।
না ঢুকলে হয়ত লেখালিখি-লিটল ম্যাগাজিন করা হত না আর। অবশ্য করেও যে বিশাল কিছু হাসিল করে নিয়েছি তেমন কোনো ভ্রম আমি রাখি না। আসলে যারা কিছুই হাসিল করার প্রত্যাশা না করে স্রেফ লিখে চলে জীবনের ঝাল-ঝোল, রাগ-জেদ-খিস্তি, মায়া-প্রেম-সোহাগের বুলি তাদের জন্যই গ্রাফিত্তি, যে স্টলের গায়ে কালো দিয়ে লেখা কালো ছোঁয়ার অমোঘ আহ্বান। কালো ছাপা অক্ষর না কী মনের অতলে-ঘিলুর গভীরে যে রহস্যময় কালো অঞ্চল। আজও ঠিক বুঝিনি!
কিনেছিলাম দুটো বই। সুভাষ ঘোষের ‘অলিখিত সুভাষ’-আদপে তার কথাবার্তার সংকলন। আর ফালগুনী রায়ের ‘নষ্ট আত্মার টেলিভিসন’। তারা যে হাংরি জেনারেশনের লেখক-কবি বলে আখ্যায়িত তা পরে জেনেছিলাম। ওই বই দুটো আমি ও আমাদের (ইলেভেনের শেষ ভাগে কলেজ বাঙ্ক মারা জনা পাঁচেক তরুণ তুর্কি) চোখের সামনে কেমন যেন এক অন্য-ভুবন খুলে দিয়েছিল!
তখন আমরাও লিখতে শুরু করে দিয়েছিলাম। যা দেখি তাই লিখি। আমরা ওই কজনে তখন ভাবছিলাম পত্রিকা করব। আর তাতে ছাপব আমাদের ওইসব লেখা। বাড়ির লোকজন দৈবাৎ পড়ে ফেলে অশ্লীল-জঞ্জাল বলে দাগিয়ে দিয়েছিল সেসব লেখা। যাইহোক, ওই বছরের সেপ্টেম্বর মাসে বেরল আমাদের সেই পত্রিকা ‘প্রতিষেধক’। বলাই বাহুল্য্ লিটল ম্যাগাজিন ও প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা সম্পর্কিত সুভাষ ঘোষের কথাবার্তা আমাদের যেভাবে নাড়া দিয়েছিল তার সজোর ধাক্কার আওয়াজ ছিল পত্রিকার প্রতি পাতায়। দ্বিতীয় পাতায় জ্বলজ্বলে কৃতজ্ঞতা স্বীকারঃ গ্রাফিত্তি।
এরপর থেকে প্রতি বছর বইমেলায় আমি গ্রাফিত্তির স্টলে কিংবা টেবিলে। গ্রাফিত্তির বইয়ের দোকান বা লেখক-পাঠক জড়ামড়ির ঠেক, শিলালিপিতেও আমি অনেকবার গেছি। কখনো একাই গিয়ে বই কিনেছি, আবার কখনো গিয়ে পড়েছি শুভদা-শর্মীদি ও অন্যান্য পান্টারদের আড্ডায়। সে এক বিরল উল্লাস ও অনেক কিছু জানা-শোনা। একসাথে।
আমার পাঠ-অভিজ্ঞতাকে বিশেষ ভাবে সম্মৃদ্ধ করেছে গ্রাফিত্তি। হাংরি জেনারেশনের লেখক-কবিদের বই-পত্র আমি প্রথম গ্রাফিত্তিতেই পাই, আর শুভদা অনুবাদ না করলে, পঞ্চাশ-ষাট দশকের অনেক মার্কিন লেখক-কবির লেখা আমার পড়াই হত না। জানাই হত না তাদের নাম। আমি খুব একটা পড়ুয়া ছিলাম না।
গ্রাফিত্তির প্রাণপুরুষ শুভদা। ওর মতো এত অবিচল, উদাসীন ও দৃঢ়সংকল্প মানুষ আমি বাংলা-বাজারে আর দুটো দেখিনি। কত দাদাকেই তো দেখলাম, বদলাতে বদলাতে এখন নিজের নামটুকুই আর যা নামমাত্র ধরে রেখেছে! কোনোদিন হয়ত বদলে ফেলেবে সেটাও!
গ্রাফিত্তি তার ঘাম-লোম-রক্ত-থুতু-লালা-বীর্য-যোনিরসের নিজস্বতা নিয়ে আজও দগদগে জেগে আছে। স্বতন্ত্র ও উজ্জ্বল। লোভ আর স্তবকতার মায়াজালটাকে এক ফুৎকারে উড়িয়ে দিয়ে টেবিল সাজিয়ে বসেছে স্রেফ ভালবাসা নিয়ে। বই-পত্রের মধ্যে দিয়ে পাঠকের আত্মার সাথে চু-কিত-কিত খেলবে বলে। টুসকি মেরে সিগারেটের ছাই ঝেড়ে, একটা পাত্তর ‘উল্লাস’ বলে ঠুকে নেবে বলে।
_____________________________________________________________
পরিশেষে, শুভঙ্কর দাশ একজন রাস্তার কবি- এটা সেই রাস্তা যা সবার নয়। হাততালি, পিঠ-চাপড়ানি, পুরস্কার ইত্যাদি উপেক্ষা করে আপোষহীন লিখে চলার রাস্তা। এটা সাধনার রাস্তা, যে রাস্তায় শুভঙ্কর বরাবর, যা তার ভাষায় ‘একা একা ফক্কড় সাধনা হলো সেই পথ যে পথে আমাদের মতো ফুটিয়া কবিরা হাঁটে।’ সেই অনন্ত পথে/রাস্তায় শুভঙ্কর কিংবা না-শুভঙ্করের অদৃশ্য চলাফেরা, আজ; যার দুধারে ‘দেখি কবিতার জন্ম হচ্ছে রোজ’…
# লেখাটি শর্মী পান্ডে সম্পাদিত ‘গ্রাফিত্তি’ পত্রিকার শুভঙ্কর দাশ সংখ্যায় (ডিসেম্বর, ২০২৪) প্রকাশিত হয়েছিল।
শুভঙ্কর দাশ
শুভঙ্কর দাশ (১৩ই মার্চ, ১৯৬৩ – ২২শে মে, ২০২৪) ছিলেন একজন ভারতীয় কবি, অনুবাদক, লেখক, সম্পাদক ও প্রকাশক। কলকাতা শহরে আজীবন স্বাধীন ভাবে লেখালিখিতে নিয়োজিত ছিলেন। বাংলা ও ইংরেজি দুটো ভাষাতেই কবিতা লিখেছেন। ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম কবিতার বই ‘বিকৃত মস্তিষ্কের গান’। কবিতা ও গদ্য মিলিয়ে প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা তিরিশের ওপর।
আমেরিকা থেকে ইংরেজিতে তিনটে কবিতার বই প্রকাশিত হয়েছে এবং সমসাময়িক বিভিন্ন আমেরিকান কবিতা সংকলনে সংকলিত হয়েছে তাঁর কবিতা। বেশ কিছু কবিতা ইংরেজি থেকে অনুদিত হয়েছে গ্রিক, ইতালিয়ান, সুইডিশ ও রোমানিয়ান ভাষায়।
ইংরেজি থেকে অনুবাদ করেছেন চার্লস বুকাওস্কি, রিচার্ড ব্রটিগান, অ্যালেন গিনসবার্গ, জ্যাক মিশেলিন, স্টিভ রিচমন্ড সহ আরও অনেক আমেরিকান কবি-লেখকের কবিতা, ছোট গল্প, জার্নাল, সাক্ষাৎকার ও উপন্যাস।
আশির দশকের শেষ ভাগে শুরু করেন ‘গ্রাফিত্তি’ নামক প্রকশনা ও পরবর্তীতে একই নামে ছোট পত্রিকা। আমৃত্যু সম্পাদনা করেছেন গ্রাফিত্তি পত্রিকা ও গ্রাফিত্তি প্রকশনা থেকে প্রকাশ করেছেন মূলধারার বাইরের কবি-লেখকদের বই ও অনুদিত বই।
ইয়োরোপে ছড়িয়ে থাকা কবি-লেখক-চিত্রকর বন্ধু-বান্ধবীদের আমন্ত্রণে কবিতাপাঠ, সাক্ষাৎ ও আড্ডার উদ্দেশ্যে গ্রিস, সুইডেন, ইতালি ইত্যাদি দেশে মাস খানেকের সফর করেন ২০১০ নাগাদ। এই সফর নিয়ে তাঁর বই ‘ইয়োরোপের দিনগুলো’ প্রকাশিত হয় তাঁর মৃত্যুর পর। প্রকাশক: হপ্তাক কাচরা।
লেখেলিখি ও সম্পাদনার কাজ করতে করতেই আকস্মিক প্রয়াণ ঘটে তাঁর।
আজও কলকাতা বইমেলা কিংবা লিটল ম্যাগাজিন মেলায় ‘গ্রাফিত্তি’ ও ‘হপ্তাক কাচরা’র টেবিলে টের পাওয়া যায় তাঁর জলজ্যান্ত উপস্থিতি।
উল্লেখযোগ্য কিছু বইঃ By the Banks of the Ajoy, Jaideb Vanishes into the Blue (Poems, ISBN 978-110534-133-5, Virgogray Press, USA, 2011), শুভঙ্কর দাশের কবিতা (কবিতা, প্রতিশিল্প, বাংলাদেশ, ২০১১), Thieves of the Wind (Poems, with Catfish McDaris, ISBN 978-1-49967-033-2, Writing Knights Press, USA, 2014), 66 lines On Your Soul (Poems, with Catfish McDaris & Kevin Ridgeway, Graffiti, 2014), Bukowski Smoked Bidis (Poems, Grandma Moses Press, USA, 2015), একা শহর ও অন্যান্য (কবিতা, গ্রাফিত্তি, ২০২১), ছায়া-সিদ্ধার্থ (গদ্য, গ্রাফিত্তি, ২০২৩), ফক্কড়নামা (কবিতা ও গদ্য, হপ্তাক কাচরা, ২০২৩) ইত্যাদি।
সৌপ্তিক চক্রবর্তী
সৌপ্তিক চক্রবর্তীর জন্ম (১৯৮৪) কলকাতায়। পেশায় সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার। লেখালিখির শুরুয়াত ২০০২ সালে। মূলত গদ্য লেখেন; মাঝে মধ্যে কবিতাও। প্রতিষেধক পত্রিকা সম্পাদনা করেছেন ২০০২ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত। কর্মসূত্রে দীর্ঘদিন ছিলেন আর্জেন্তিনায়। লেখালেখি আর তথ্যচিত্রে ধরেছেন সেদেশের জীবনযাপন। বর্তমানে সম্পাদনা করছেন থাবা (https://thaba.in/) ওয়েবপত্রিকা। নিজের লেখা, বানানো তথ্যচিত্র ও তোলা ছবি দিয়ে সাজিয়েছেন তাঁর ব্লগ: সৌপ্তিক চক্রবর্তী ONLINE (https://souptikchakraborty.blogspot.com/)।
প্রকাশিত বই: পেডলার পান্না ও অন্যান্যরা (উপন্যাস, ২০২৫), গোপাল গোঁসাই (নভেলেট, ২০২৫), কমরেড নয়ন (নভেলেট, ২০২৪), লাশ (গল্প সংকলন, ২০২৩), বুয়েনস আইরেসের হাওয়া (নভেলেট, ২০২০) ইত্যাদি।
পরিচালিত তথ্যচিত্র: আর্জেন্তিনা আমা ইন্ডিয়া (৭৩ মিনিট, ২০১৮, আর্জেন্তিনা) ও রিহ্যাব (৫৯ মিনিট, ২০১৩, ভারত)।