বেঁচে থাকা এমনই মজার
১.
সালটা ১৯৯০ বেশ কিছু অন্যরকম পত্রিকা ও বই আমার হাতে এসে পৌঁছল সেগুলো যে আমার চেনা পৃথিবী থেকে বেশ কিছুটা আলাদা সে ব্যাপারে কোন সন্দেহ ছিল না। আমার এক বন্ধু ও আমিই ভাগ করে পড়া শুরু করলাম। সেই প্রথম আমার পরিচয় হলো সুবিমল মিশ্র, অমিয়ভূষণ কমল কুমারের সাথে। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, বিভূতিভূষণ, শক্তি, সুনীল পড়া আমি পড়তে শুরু করলাম অনন্য রায়, মলয় রায় চৌধুরী, শুভঙ্কর দাশ ও আরো এক ঝাঁক নতুন কবিদের।
কৌরব, বিজ্ঞাপনপর্ব, ইডিয়েট এর পাঁচালী, কবিতা ক্যাম্পাস – পাতিরামের সামনে দাঁড়িয়ে পড়তে লাগলাম এমন অনেক পত্রপত্রিকা। এদের মধ্যে ইডিয়েটের পাঁচালী নামটা আমাকে বেশ টানে নিজেদের নিজেরাই ইডিয়েট বলে চিহ্নিত করার এই আধুনিকতা ছিল চমৎকার। ততদিনে অবশ্য আমার পত্রিকা অর্বাচীন এর প্রথম সংখ্যা বেরিয়ে গেছে।
কলকাতায় ছাতিম ফুলের গন্ধ ছড়াচ্ছে শীত চৌকাঠ ছুঁই ছুঁই। বন্ধুরা মিলে কফি হাউসে বসে আছি এদিক ওদিক দেখছি কার ঘাড় ভেঙে একটু টোস্ট বা পাকোড়া খাওয়া যায়, এমন সময় এক বন্ধু দূরের একটা টেবিল দেখিয়ে বলল ওই দেখ ওই টেবিলটায় যারা বসে আছে ওদের মধ্যে অনেকেই ইডিয়েটের পাঁচালীতে লেখে। শুনেই মনটা খুশি হয়ে গেল, কিঞ্চিত অবাকও। সোজা চলে গেলাম ওই টেবিলটায় পাশে দাঁড়িয়ে বললাম আপনারাই ইডিয়েট? যে চার পাঁচ জন বসে ছিল তারা সবাই আমার দিকে তাকালো আমি আরো এক্সাইটেড হয়ে বললাম আমি ইডিয়েটের পাঁচালী পড়েছি, ওরাও সৌজন্যতায় আমার সাথে কথা বলল টেবিলের বাঁদিকে বসা মোটা কাচের চশমা পরা মোটা গোঁফঅলা ফর্সা লোকটা আমাকে প্রশ্ন করল ‘তুমি কবিতা লেখো?’ আমি মাথা নেড়ে সম্মতি জানিয়ে বললাম ‘আমারও একটা পত্রিকা আছে’ এরকম দু একটা কথা বলেই সেদিন ফিরে এসেছিলাম। কারোর নামই আলাদা করে জানা হয়নি সেদিন, কারণ সেই মুহূর্তে আমার কাছে ওরা সবাই ছিল ইডিয়েট এর পাঁচালীর এক একটা ইডিয়েট।
দশক গ্রুপ লেখার ধারা বা নিছক দলবাজির ভাগাভাগি গুলো সম্পর্কে আমার কোন ধারনাই ছিল না। কৈশোরের উচ্ছলতায় তখন আমি যা দেখছি সবই নতুন, কফি হাউস ছিল সেরামই এক নতুন পৃথিবী। কড়া কফির গন্ধের সাথে সদ্য ছাপা ফর্মার কালির গন্ধ মিলেমিশে তৈরি হয়েছিল সেই আজব পৃথিবীটা। মাথার উপর গোল করার নিকোটিন মেঘে ছুঁয়ে থাকতো তর্কবিতর্কের অজস্র সব রেখা। আর আস্তে আস্তে ক্যানভাসে ফুটে উঠতে লাগলো চেনা মুখ মানুষের ভিড়। বিকেলে পাতিরাম বা দে’বুক ষ্টোরের রতনদার দোকানে কয়েকটা বই পড়ে ফেলার পর একটু আলো কমতেই কফি হাউসের ধোয়ারা ডাক দিত আমায়। এভাবেই কলকাতার ফুটপাথে শুকনো পাতার ভীড় বাড়লে গায়ে সোয়েটার চাদর হালকা জ্যাকেট উঠলো সকলের। গ্রন্থমেলায় চেনা চেনা কিছু লিটিল ম্যাগের টেবিল দেখতে পেলাম। আমি কিন্তু তখনও বড় ঝোলার গভীরে শতবর্ষের শ্রেষ্ঠ ভূতের গল্প বা পাতাল রেলে ভুত লুকিয়ে রেখেছি। এক বড় অদ্ভুত সময় ভূত তখনো বাঁ হাতের তালুতে হাত বোলাচ্ছে আর ডান হাত পুড়ে যাচ্ছে সুহাসিনী পমেটমের নরম আগুনে। ততদিনে পড়ে ফেলেছি “ভাষার গালে যদি তুমি দু’চারটে চড় বসিয়ে নাই দিতে পারলে তবে তুমি কিসের লেখক?” সেই মুহূর্তে আমি ভাষাকে ভাঙতে না পারলেও প্রত্যেকবার ভাষা আমাকে ভাঙছিলো আর অপর মুহূর্তে সেই ভাষাই তৈরি করছিল এক নতুন “আমাকে”।
২.
এভাবেই কেটে যাচ্ছিল সময়। কলকাতা বইমেলায় একটা ছাতার তলায় একটা সাদা কাগজে কালো মার্কার দিয়ে সাবলীল অক্ষরে লেখা একটা ছোট্ট পোস্টার চোখে পড়ল, লেখা আছে “সুবিমল মিশ্র”। আসলে নামটাই যথেষ্ট তাই সেটা দেখেই এগিয়ে গেলাম, টেবিলে রাখা আছে সুবিমল মিশ্রের সব বই আর কিছু পত্র – পত্রিকা। টেবিলের পেছনে বসে থাকা মধ্যবয়সী রাগী রাগী দেখতে মানুষটা এক মনে প্রুফ দেখে যাচ্ছে। আমার উপস্থিতি যেন বাতাসের মতো হাল্কা, সেদিন সেই টেবিলে দাঁড়িয়ে বুঝেছিলাম অন্য ধারার এই বইগুলো হাতে পেলেও তা কিনে ফেলা ঠিক ততটা সহজ নয়। সুবিমল দার একটা বই কেনার জন্য একটা ছোটখাটো ইন্টারভিউ দিতে হলো আমাকে। বুঝলাম, শিখলাম, জানলাম সব জিনিস টাকা থাকলেই কিনে নেয়া যায় না, কিছু জিনিস পেতে গেলে তা অর্জন করতে জানতে হয়। সত্যি বলতে জীবনে প্রথমবারের জন্য সুবিমল মিশ্রের সাথে কথা বলতে গিয়েই টের পাচ্ছিলাম যে মনের মধ্যে এক অদ্ভুত ক্যাকেফোনি তৈরি হচ্ছে। সুবিমল দা’র দুটো বই, এবং “সমবেত আর্তনাদ” নামের একটা কাগজ কিনে সেদিন লতা মঙ্গেশকরের গান ছাড়াই উড়তে উড়তে বাড়ি ফিরলাম আমি।
দু’দিন বাদে আবার বইমেলার মাঠে ঋক বৈদিকের টেবিলে দু তিনজন বন্ধুর সাথে দেখা হলো, গল্পগাছা হলো আলাপ হলো সম্পাদক উত্তর বসুর সাথে। উত্তরদা বললেন, তোমারা লেখা শুনিও। আমরাও উৎসাহে রাজি হলাম সত্যি বলতে আমি তখন চূড়ান্ত কনফিউসড নিজের লেখাগুলোকে কিরকম স্লেটের অক্ষরে হাত বোলানো মনে হচ্ছে। লেখাগুলোর ভেতর কি যেন নেই নেই, তারা অক্ষর হলেও ঠিক যেন অক্ষর নয় অক্ষরের মতো কিছু একটা। একটা অস্থিরতা নিজের মনে কিছু অজানা গন্ধ, মাথার ভেতর নতুন কিছু ফর্মার ভাঁজাই হচ্ছিল তখন। পরের দিন আবার চলে গেলাম উত্তর দার টেবিলের সামনেই কালো মার্কার এর পোস্টার ঝোলানো সেই টেবিলেটাতে। একইভাবে বই সাজানো আছে কিন্তু টেবিলে সুবিমল দা নেই। বরং টেবিলের দু চার হাত দূরেই দাঁড়িয়ে আছে কফিহাউসে ইডিয়ট এর পাঁচালীর টেবিলের চোখে চশ্মা মোটা গোঁফ কোঁচকানো চুলয়ালা সেই লোকটা। জিন্সের প্যান্ট টি-শার্ট পরে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটা উল্টোদিকে ফিরে কাঁচের বোতল থেকে কি যেন একটা ঢকঢক করে গলায় ঢালছে আমি এগিয়ে এসে সামনে দাঁড়াতে তার মুখ দেখে মনে হলো না যে সে আমাকে চিনতে পারছে। অথচ কফি হাউসে সেদিন এর সাথেই আমার কথা হয়েছিল তাই আমি সৌজন্যতার হাসি হেসে জিজ্ঞেস করলাম “সুবিমল মিশ্র আজকে নেই?’ কাজে বাঁধা পড়ায় একটু বিরক্ত হয়ে বোতলটা নামিয়ে আমার দিকে প্রায় না তাকিয়ে বলল “এখনো আসেনি। একঘন্টা পরে আসবে।” তার কথার বাতাসেই আমি বুঝেছিলাম যে বাবা ঠিকই বলেন, এইসব লেখক কবিদের থেকে দূরে থাকাই ভালো তাদের স্বভাব চরিত্র ভালো নয়। যাইহোক আর কোনো কথা না বাড়িয়ে সেই অচেনা মদের গন্ধ নাকে মেখে আমি ফিরে এলাম উত্তর বসুর টেবিলেই । বেশ কিছুটা অবাক নিয়ে উত্তরদাকে বললাম “জানো? ওই লোকটা ওইখানে দাঁড়িয়ে মদ খাচ্ছে”। উত্তরটা একবার সেই দিকে তাকিয়ে দেখে নিয়ে বলল ওই লোকটা কিরে ওকে চিনিস না? ও তো শুভঙ্কর, খুব ভালো লেখে। আমি লোকটাকে আবার আপাদমস্তক একবার দেখে নিয়ে আরো অবাক হয়ে প্রশ্ন করলাম “শুভঙ্কর! মানে শুভঙ্কর দাশ? আমি তো ওর লেখা পড়েছি।”
৩.
ওই বইমেলাটা ছিল অনেকটা চিচিং ফাঁকের দরজার মতো যত সময় কাটতে লাগলো আমিও নতুন একটা পৃথিবীর দরজা-জানলা ঘুলঘুলি দিয়ে ভেতরে ঢুকতে লাগলাম। অর্বাচীন এর সেটাই ছিলো প্রথম বইমেলা। যদিও অর্বাচীন আমার প্রথম কাগজ নয় এর আগেই সৌরভের সাথে যৌথ সম্পাদনায় কালির আঁচড় নামে একটা কাগজ আমি করেছিলাম। তখন সেভাবে কাউকে চিনতাম না বাড়ির নিচে প্রেস-এ অগুন্তি হলুদ চটি বইয়ের ফাঁকে গুঁজে দেওয়া আমাদের এক ফর্মার একটা কাগজ। যতদূর মনে পড়ে সেই কাগজে আমরা নিজেরাই নামে বেনামে গোটা কয়েক করে কবিতা লিখেছিলাম। সম্পাদকদের পাতা ভরানোর এই বেদনা যে কি সেটা সেই থেকেই বুঝতে শুরু করেছিলাম। এছাড়াও ছিল বন্ধু-বান্ধব, বাংলার মাস্টারমশাই ও কয়েকজন আত্মীয়র লেখা। ছাপাখানার মালিকও বাড়িওয়ালার বাচ্চাদের বেয়ারা আবদার মেনে নিয়ে কয়েক খানা কপি ছেপে দিয়েছিল। এইভাবেই শুরু হয়েছিল আমার কাগজ করার জার্নি।
হ্যাঁ যা বলছিলাম, বইমেলা – অর্বাচীনের প্রথম সংখ্যা। সেও এক দিশাহীন মলাট যুগল, ভেতরে আছে পাতা ভরানোর তাগিদ। সেই সংখ্যার অপটুতা বিষয়হীনতা বা বোধের অভাব ছিল স্বাভাবিক এবং স্বতঃস্ফূর্ত। সাহিত্যের ইতিহাস পলিটিক্স বা প্রতিষ্ঠান অপ্রতিষ্ঠান কোনটাই আমি মায়ের পেট থেকে শিখে আসিনি, সময়ের সাথে সাথে পড়াশোনার মধ্যে দিয়ে নিজের বোধ ও অভিজ্ঞতা দিয়ে অনুভব করেছি এবং ধারণ করেছি। তাই আজ যতই বেমানান বা অবাক লাগুক না কেন যতই না-শর্মী পাণ্ডে মনে হোক না কেন ঘটনা হলো অর্বাচীনের প্রথম সংখ্যার প্রচ্ছদে পাইকা বোল্ডে লেখা ছিল “আমরা বাঁচতে চাই আমাদের বাঁচতে দাও।” সেই বইমেলাতেই প্রথম তিন চার দিনের মধ্যেই আমাদের কাগজের প্রায় সব কপি বিক্রি হয়ে গেল। না না রবীন্দ্র রচনাবলীর মতো লোকে লাইন দিয়ে কিনে নিয়ে গেল তা নয় বরং অমন সব লাইনে দাঁড়ানো মানুষগুলোকে দুটাকার বিনিময় কখনো ভালো করে কখনো ঝাড়ি মেরে কখনো অনুরোধ করে কখনো পড়া ধরে কখনও হুল দিয়ে কাগজগুলো বিক্রি করা হলো। শীতকালের কাঁচা মিঠে রোদ পিঠে মেখে সুন্দর রবীন্দ্র রচনাবলীর লাইনে দাঁড়িয়ে নিজেকে পাঠক ভাবা মানুষটিকে হঠাৎ করে গিয়ে প্রশ্ন করা রবীন্দ্রনাথের তিনটি উপন্যাসের তিনটে প্রধান চরিত্রের নাম না বলতে পারলে এই লাইন থেকে বেরিয়ে যেতে হবে বা এই কাগজটা এখনই কিনতে হবে। আসলে রবীন্দ্রনাথ কিনে বাড়ি ভরিয়ে নিজেকে সংস্কৃতিবান ভাবার আগে একটাও লিটল ম্যাগাজিন না পড়াটা দণ্ডনীয় অপরাধ সেটা বোঝানোর দায়িত্ব আমরাই কাঁধে তুলে নিয়েছিলাম।
মেলার ৩-৪ দিনেই আমি ও আমার বন্ধুরা হাতে হাতে কাগজ বিক্রি করার এই গেরিলা পদ্ধতি রপ্ত করে ফেললাম। এদিকে অর্বাচীনের সংখ্যা শেষ, উত্তর বসুর কাছে ঋক বৈদিকের টেবিলে গিয়ে বললাম, দাও উত্তর দা তোমার কাগজটা আমরা বিক্রি করে দিই। কিন্তু সে বছর ঋক বৈদিকের একটা মোটা সংখ্যা হয়েছিল হাতে হাতে ফেরি করার জন্য আমাদের দরকার ছিল পাতলা পাতলা কাগজ। উত্তর দাই বলল, দাঁড়া শুভঙ্করকে বলি, কিছুক্ষণ বাদে উত্তর দা একগাদা কাগজ নিয়ে এলো, সারা বছর ধরে বেরোনো সব পাতলা পাতলা সংখ্যা, ইডিয়েটের পাঁচালী, সমবেত আর্তনাদ, কবিতা ক্যাম্পাস, আরো কিছু কিছু অন্যান্য কাগজের। আমাদের হাতে ওই মিশ্রিত বান্ডিল ধরিয়ে দিয়ে বললেন শুভঙ্কর বলেছে ২ টাকা করে দাম কিন্তু তোরা এক টাকা করেই বিক্রি করে দিস আসলে মানুষের কাগজগুলো পড়াটা সব থেকে বেশি দরকার। আমিও আড়চোখে দূরের টেবিলে দাঁড়িয়ে বই গোছানো শুভঙ্কর দাশকে দেখে নিলাম এক ঝলক। তারপর আর কি সেই থেকে আমাদের বন্ধুদের শুরু হল লিটিল ম্যাগের গণসেবা। সে বছর কত মানুষের কাগজ যে চেয়ে চেয়ে নিয়ে গিয়ে বিক্রি করে দিয়েছি তার কোন হিসেব নেই। সেই কাগজ বিক্রির ম্যারাথন মেলায় আমাদের রুটিন ছিল অসাধারণ। মেলায় ঢুকেই লোকনাথ বাবা না ইসকন কার যেন একটা স্টল ছিল সেখানে লাইন দিয়ে মিহিদানা খাওয়া তারপর টেবিলে টেবিলে গিয়ে পত্রিকা কালেক্ট করে সারা মেলা ঘুরে ঘুরে পত্রিকা ফ্লাই করা (এমনটাই বলতাম তখন আমরা)। বিকেল হলেই চেনা লোক খুঁজে তাদের ঘাড় ভেঙে মেলার কফি হাউসে গিয়ে কফি আর অনিয়ন পাকোড়া খাওয়া। মেলা বন্ধের আগে আবার টেবিলের টেবিলে গিয়ে তাদের বিক্রির টাকা দিয়ে আসা তারপর রাতে কিভাবে বাসের টিকিট না কেটে বাড়ি ফেরা যায়, তার নিত্যনতুন কৌশল আবিষ্কার। শুভঙ্করের সাথে এই মেলাতে বারবার দেখা হয়। আমাদের একটা কাগজ দিয়েছিলাম কয়েক পাতা উল্টে পাল্টে দেখে বলল “কার কাছে বাঁচতে দাও বাঁচতে দাও বলে ভিক্ষে চাইছে তোমরা? যদি লিখতেই হয় তো লেখো আমরা বাঁচবো, বাঁচবোই। দেখি কে আটকায়। শোনো এরকম ন্যাকা ন্যাকা কাগজ আমাকে দিও না আমার বাড়িতে না জায়গা নেই।” সত্যি বলতে কি খুব খারাপ লেগেছিল মনে হয়েছিল পৃথিবীর সব থেকে খারাপ মানুষের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছি, একটু ভালোভাবে কথা বলতেও জানেনা অথচ রোজ এরই কত না কাগজ বিক্রি করে দিচ্ছি। ধন্যবাদ দেওয়া তো দূরের কথা মুখের উপর অপমান করছে। কিছু না বলে চলে এসেছিলাম। ওদের টেবিল থেকে আনা দুই টাকা দামের কাগজগুলো যেগুলো আমাদেরকে এক টাকা করে বিক্রি করতে বলা হয়েছিল সেদিন সারাদিন ধরে আমরা সেগুলোকে দুই টাকা করে বিক্রি করি এবং সবাই মিলে সেই বাড়তি টাকা দিয়ে কফি হাউসে বসে চিকেন পকোড়া খেয়ে মনের জ্বালা পেটের ভেতর দিয়ে মিটিয়েছিলাম।
মেলার শেষ দিন শুভঙ্কর আমাদের হাতে বেঁচে যাওয়া পত্রিকাগুলোর থেকে একটা করে সংখ্যা দিয়ে বলল “এই কাগজগুলো তোমাদের জন্য আরো কিছু কিছু ভালো পত্রিকা বের হয় সেগুলো পড়ো, অন্যরকম বইপত্র পড়ো তখন বুঝতে পারবে লিটিল্ ম্যাগাজিনটা পাড়ার পুজোয় বেরোনো সুভেনের নয়। একটা কাগজ করার আগে ভাষার ইতিহাস, সাহিত্যের ধারা এগুলো বুঝতে হবে তো! কাগজ করার আগে নিজেকে প্রশ্ন করো কাগজ কেন করছ, বুঝলে?” আমরা চুপ করে শুনলাম এত কথা বলার কারণ আমাদের প্রতি ভালোবাসা না ঝোলা ব্যাগে রাখা রঙিন বোতল ঠিক বুঝলাম না তবে কথাগুলো যে আমাকে ভাবাতে শুরু করল সেটা সত্যি।
# লেখাটি শর্মী পান্ডের চলমান একটি দীর্ঘ লেখার অংশ এবং এই অংশটি প্রকাশিত হয়েছিল প্রিয়াঙ্কা গুহ সম্পাদিত ‘কাগজের ঠোঙা’ পত্রিকার শুভঙ্কর দাশ সংখ্যায় (১৩ই মার্চ, ২০২৫)।
শুভঙ্কর দাশ
শুভঙ্কর দাশ (১৩ই মার্চ, ১৯৬৩ – ২২শে মে, ২০২৪) ছিলেন একজন ভারতীয় কবি, অনুবাদক, লেখক, সম্পাদক ও প্রকাশক। কলকাতা শহরে আজীবন স্বাধীন ভাবে লেখালিখিতে নিয়োজিত ছিলেন। বাংলা ও ইংরেজি দুটো ভাষাতেই কবিতা লিখেছেন। ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম কবিতার বই ‘বিকৃত মস্তিষ্কের গান’। কবিতা ও গদ্য মিলিয়ে প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা তিরিশের ওপর।
আমেরিকা থেকে ইংরেজিতে তিনটে কবিতার বই প্রকাশিত হয়েছে এবং সমসাময়িক বিভিন্ন আমেরিকান কবিতা সংকলনে সংকলিত হয়েছে তাঁর কবিতা। বেশ কিছু কবিতা ইংরেজি থেকে অনুদিত হয়েছে গ্রিক, ইতালিয়ান, সুইডিশ ও রোমানিয়ান ভাষায়।
ইংরেজি থেকে অনুবাদ করেছেন চার্লস বুকাওস্কি, রিচার্ড ব্রটিগান, অ্যালেন গিনসবার্গ, জ্যাক মিশেলিন, স্টিভ রিচমন্ড সহ আরও অনেক আমেরিকান কবি-লেখকের কবিতা, ছোট গল্প, জার্নাল, সাক্ষাৎকার ও উপন্যাস।
আশির দশকের শেষ ভাগে শুরু করেন ‘গ্রাফিত্তি’ নামক প্রকশনা ও পরবর্তীতে একই নামে ছোট পত্রিকা। আমৃত্যু সম্পাদনা করেছেন গ্রাফিত্তি পত্রিকা ও গ্রাফিত্তি প্রকশনা থেকে প্রকাশ করেছেন মূলধারার বাইরের কবি-লেখকদের বই ও অনুদিত বই।
ইয়োরোপে ছড়িয়ে থাকা কবি-লেখক-চিত্রকর বন্ধু-বান্ধবীদের আমন্ত্রণে কবিতাপাঠ, সাক্ষাৎ ও আড্ডার উদ্দেশ্যে গ্রিস, সুইডেন, ইতালি ইত্যাদি দেশে মাস খানেকের সফর করেন ২০১০ নাগাদ। এই সফর নিয়ে তাঁর বই ‘ইয়োরোপের দিনগুলো’ প্রকাশিত হয় তাঁর মৃত্যুর পর। প্রকাশক: হপ্তাক কাচরা।
লেখেলিখি ও সম্পাদনার কাজ করতে করতেই আকস্মিক প্রয়াণ ঘটে তাঁর।
আজও কলকাতা বইমেলা কিংবা লিটল ম্যাগাজিন মেলায় ‘গ্রাফিত্তি’ ও ‘হপ্তাক কাচরা’র টেবিলে টের পাওয়া যায় তাঁর জলজ্যান্ত উপস্থিতি।
উল্লেখযোগ্য কিছু বইঃ By the Banks of the Ajoy, Jaideb Vanishes into the Blue (Poems, ISBN 978-110534-133-5, Virgogray Press, USA, 2011), শুভঙ্কর দাশের কবিতা (কবিতা, প্রতিশিল্প, বাংলাদেশ, ২০১১), Thieves of the Wind (Poems, with Catfish McDaris, ISBN 978-1-49967-033-2, Writing Knights Press, USA, 2014), 66 lines On Your Soul (Poems, with Catfish McDaris & Kevin Ridgeway, Graffiti, 2014), Bukowski Smoked Bidis (Poems, Grandma Moses Press, USA, 2015), একা শহর ও অন্যান্য (কবিতা, গ্রাফিত্তি, ২০২১), ছায়া-সিদ্ধার্থ (গদ্য, গ্রাফিত্তি, ২০২৩), ফক্কড়নামা (কবিতা ও গদ্য, হপ্তাক কাচরা, ২০২৩) ইত্যাদি।
শর্মী পান্ডে
১৯৯০ সাল থেকে লেখালেখি করছি। প্রথম সম্পাদিত পত্রিকা অর্বাচীন। গ্রাফিত্তি পত্রিকার সাথে শুরুর সময় থেকে যুক্ত। গ্রাফিত্তি পত্রিকার সম্পাদনা করেছি। নিজস্ব লেখালেখি ছবি আঁকা স্কাল্পচার অনুবাদ। ২০০১ নাগাদ বোম্বে চলে যাই ফিল্মের কাজকর্ম করতে। ২০০৩ প্রথম ইন্ডিপেন্ডেন্ট শর্ট ফিল্ম ‘এবং ফাল্গুনী’। বেশ কিছু আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে সিলেক্টেড হয়, দেখানো হয়। দু জায়গা থেকে অ্যাওয়ার্ড পেয়েছিল। ঢাকা চলচ্চিত্র পরিষদ বা ভুবনেশ্বরের বিজু পট্টনায়ক ফিল্ম ইনস্টিটিউট কিংবা বাই অফ ফেস্টিভাল এরা সবাই ‘এবং ফাল্গুনী’কে বিশেষ সম্মান প্রদান করেছে। বেশ কিছু ছবি করেছি, সেগুলো বিদেশে সিলেক্টেড হয়েছে এবং দেখানো হয়েছে ….
একচুয়ালি কি আরো অনেক কিছু তো করেছি ওরাম ভাবে খেয়াল নেই
বোম্বেতে টানা অনেকগুলো বছর কাজ করেছি। টিভি চ্যানেল হেড করেছি, রেডিও স্টেশন হেড করেছি…… কী না করেছি
কী বলব এগুলো নিয়ে আমি জানিনা…..
বরং ‘আমি মানুষ একজন প্রেম-পেচ্ছাপ দুটোই করতে পারি’…