thaba.in

সোমনাথ ঘোষালের ছোট গল্প​

শেয়ার করুন

বালির পুতুল  

বালিকে যতই মুঠোয় চেপে ধরি না কেন ঠিক হারিয়ে যায়। হাতে শুধু ছাপ পড়ে থাকে। যতদূর চোখ যায় জল। গভীর সমুদ্রে ঢেউ থাকে না। শান্ত। গম্ভীর! শয়ে শয়ে পাখি। মাছের অপেক্ষায়। মাছগুলো প্রতিটা ঢেউয়ের সঙ্গে ঝাঁকে ঝাঁকে পারে এসে আবার ফিরে যাচ্ছে। কেন যে আসছে মরতে! দুপুর শেষে দুটো বাচ্চাও পাখিগুলোর মতোই মাছের অপেক্ষায়। ঘরে হয়তো ভাত আছে। মাছ ভাজা দিয়ে খাবে! এখানে সবাই সবার জন্য অপেক্ষা করছে। যে মাছগুলো আজ ফিরতে পারবে না, তাদের মধ্যে কেউ কেউ বালির ওপর রূপোলি স্বপ্নের মতোন চকচক করবে। আমি খুব কাছ থেকে ওর দেহটা দেখব, তারপর অন্য দৃশ্যে ফিরে যাব। ততক্ষণে পাখি হয়তো চলে আসবে! এইখানে সারাবছর ঘরভাঙার কান্না শোনা যায়। ঝড় বৃষ্টিতে তছনছ করা শরীর। সবটাই  অস্থায়ী। ত্রাণের অপেক্ষায় পেটের গাছপালাগুলো শুকিয়ে কাঠ হয়ে যায়। যে যত দূরে থাকে তার কাছে মৃত্যুই  সহজ জীবন! 

শ্যামলী ছোটো মেয়ে পুলিকে নিয়ে কলকাতায় চলে এসেছে। লোকের বাড়িতে কাজ করে চলতে হবে। বাপদাদার সংসারে তিনটে পেট নিয়ে রোজ অশান্তি। বড়ো মেয়ের মাধ্যমিক হয়ে গেলে ওকেও কলকাতার স্কুলে ভর্তি করাবে। ছোট মেয়ে পুলি এখন পাঁচ বছর। সামনের বছরে স্কুলে নেবে বলছে। এখানেই হাজার টাকার একটা ঘর ভাড়া নিয়ে লোকের বাড়ি বাড়ি কাজ খুঁজছে। গ্রামের যে দিদির ভরসায় কলকাতায় এসেছে তার সঙ্গেও ঝামেলা। এদিকে বাপের বাড়িতেও ফিরে যাবে না শ্যামলী। নাহ আর ওই বালির জায়গায় ফিরবে না। অল্প বয়সে পালিয়ে বিয়ে করেছিল বলে দু বাড়িতেই ঝামেলা। বাপের বাড়ি পরে মেনে নিলেও বরের বাড়িতে পণের জন্য ঝগড়াঝাঁটি লেগেই থাকত। বছরে বছরে ঘূর্ণিঝড় আর বৃষ্টিতে দোকান ভাঙে। তারপর শ্যামলীর বর  মোড়ের দোকানটাও বেচে দিল। নাকি অনেক ধার হয়েছিল। শ্যামলীর ঠিক বিশ্বাস হয়নি! চলে তো যাচ্ছিল… দোকান বেচার পর বাপি কিছুদিন টোটো চালিয়েছিল। তেমন সুবিধে করতে পারেনি। ততদিনে মদ খাওয়াও বেড়ে গেছে। কয়েক বছর পর পুলি হতেই আরও অশান্তি। মেয়ের কোলে আবার মেয়ে! সংসারে একেই অভাব! বাপি সারাদিন বাড়িতে নয়তো মদ খেয়ে কোথাও একটা পড়ে থাকে। 

শ্যামলীর বাগানের খুব শখ। কিছু না কিছু সবজি ফলাতে পারে। শুরুর দিকে বাপির খুব পছন্দ হতো। বলত, একসঙ্গে চাষ করে বাজারে বেচব। এখন সবটাই বিষ। কিছুদিন বাপের বাড়িতে গিয়ে থেকেছিল। কিন্তু বুঝেছে ওখানেও আর জায়গা নেই! মা-বাপ যতদিন আছে একটু ভাত পাবে। বাপি এখন লোকাল নেতার এজেন্টদের সঙ্গে ওঠাবসা শুরু করেছে। গ্রামের বেশিরভাগ ছেলে এইসব এজেন্টের মারফত দুবাই চলে যাচ্ছে মিস্ত্রির কাজ নিয়ে। ছয়মাস দাঁত কামড়ে পড়ে থাকলেই মোটা টাকা। কেউ কেউ ফিরে নাকি বাড়ি, বাইক করে ফেলেছে। কিন্তু যেতে গেলে টাকা লাগবে!  

দুই মেয়েকে নিয়ে শ্যামলী মাটিতে শোয়। তক্তাপোষে বাপি। পুলি হবার পর থেকে ওপরে জায়গা হয় না। বাপি মদ খেয়ে খাট থেকে আস্তে আস্তে মাটিতে নেমে শ্যামলীর পায়ের কাছে বসে ডাকে, শোন তোর সঙ্গে কথা আছে। 

এত রাতে কী কথা? সকালে মাঠে যেতে হবে। 

শোন না, এরপর আর টাকার অভাব থাকবে না রে। আমাদের অনেক টাকা হয়ে যাবে। 

শোনো, তুমি কী বলবে আমি জানি। আর আমার বাপের বাড়ি থেকে টাকা চাওয়া যাবে না। আমাকে দেবে না বলছে। 

না না, ধার নেব। সুদ দিয়ে ফেরত দেব।

ধার! এর আগেও টোটো কেনার সময় ধার নিয়েছ। সেই টাকা ফেরত দাওনি। বাপ-দাদাকে আর কিছুতেই বলব না। 

তোর পায়ে ধরছি। এই শেষবার। আমাদের অনেক টাকা হয়ে যাবে। 

তুমি বাইরে থেকে ধার করো।

কে দেবে? তোদের ওই জমিটা বেচে দিয়ে বা বাঁধা দিয়ে দে। 

ওটা আমার জমি? আমি মরে গেলেও হবে না!

বাপি শ্যামলীকে জড়িয়ে চেপে ধরে। বুকে মুখ ঘষতে ঘষতে বলে, এই টাকাটা দে। বাপিকে ঝাপটা মেরে সরিয়ে দেয়। বলে, এইভাবে তোমাকে অনেক টাকা দিয়েছি, আর নয়। চুলের মুঠি ধরে শ্যামলীকে কোমর বরাবর এলোপাথাড়ি কয়েকটা লাথি মারে বাপি। মুখ খুব বেড়েছে মাগীর। পুলি কেঁদে ওঠে। খিস্তি মেরে বাপি ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। পাশের ঘর থেকে বাপির মা গজগজ করে, ছেলেটাকে খাবি নাকি আভাগীর বেটি! ডাইনি মরেও না…! সারারাত দাওয়ায় বসে থাকে শ্যামলী। চৈত্রের শেষ। আবার ঘর ভাঙবে। সবকিছু ডুবে যাবে। আবার ত্রাণ! তিরতির করে হাওয়া দিচ্ছে। বাগানের লাউ, লঙ্কা, ফুলগাছগুলো কেমন যেন শুকিয়ে গেছে। যেখানে শান্তি নেই সেখানে তো মাটি শুকিয়ে যাবেই। বহুকাল বাপি জড়িয়ে ধরে না। এতদিন পর যখন জড়িয়ে ধরল, তখন টাকার জন্য। শ্যামলীর শরীরটাও এখন আর সাড়া দেয় না। 

সিঙ্কে বাসনের স্তুপ। রবিবার, তাই বাসন বেশি পড়েছে! এখন চার বাড়িতে কাজ করে। সবকিছু এখনও শিখে উঠতে পারেনি শ্যামলী। পুলিকে নিয়ে চিন্তা। বড়ো মেয়েটা তাও একটু বড়ো হয়েছে। নতুন জায়গায় চালচলন কথাবার্তা সবকিছুই আলাদা। ছয় মাসের ওপর কেটে গেছে। আরও কয়েকটা কাজ ধরতে পারলে সুবিধা। বাপের বাড়িতে বড়ো মেয়েটার জন্যও টাকা পাঠাতে হবে! আর কয়েকদিন পর পুজো। শ্যামলী ঠিক করে এই পুজোতে আর বাড়ি যাবে না। পুলি খুব দুরন্ত। সারাক্ষণ চরকির মতন ঘুরে যাচ্ছে। যদি পড়ে গিয়ে হাত-পা ভাঙে, শ্যামলীর এই এক দুশ্চিন্তা।  

আজ ছুটি নিয়ে বাড়ি থেকে আনা সব কাপড়চোপড় কেচে বাগানে মেলেছে। পুলি এখন পাশের বাড়িতে এক দিদির কাছে পড়তে যায়। একটু মুরগির ঝোল আর ভাত করেছে। পুলি খেয়ে পড়তে গেছে। পুলি এলে একসঙ্গে খাবে। জানলার ধারে বসে একটু। ছুটির দিন ছাড়া বসার সময় হয় না এখানে। জানলা পেরিয়েই একটা পুকুর। ধারে নারকেল, নিম, ঝোপঝাড়। এখানেও পাখি আসে। কিন্তু অত পাখি নেই। সেইদিন স্কুল থেকেই পালিয়েছিল বাপির হাত ধরে। মন্দিরে বিয়ে। তারপর জানলো সই করতে হবে! বছর খানেক পর সেটাও হয়ে গেল। বাপ অনেকদিন কথা বলেনি। একটাই মেয়ে শ্যামলী। খুব ভালোবাসত। বাপের হাত ধরেই মাঠের কাজ শিখেছিল। বাপ এক বিঘা জমি দিয়ে বলেছিল এই জমিতে চাষ করবি। এটাই আমার প্রথম জমি। তুই নে মা। একে কোনোদিন বেচিস না। সেই জমিই এখন বাঁধা দেওয়া। টাকা না দিলে হাতছাড়া হয়ে যাবে। বাপি এখন আলেকালে দুবাই থেকে ফোন করে। শ্যামলী টাকার কথা বলতে গেলেই খিস্তি দেয়। পুকুরের ধারে একটা সাদা বক ছোট্ট সাপ ধরে খাচ্ছে। গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি রোদের জল পড়ছে চারপাশে। চোখ ভিজে যায় শ্যামলীর। আসলে কান্না তো রোগ! সেই ছোটোবেলা থেকে  লুকিয়ে কেঁদে যাচ্ছে তবুও কান্না সারে না… 

দাদার সাইকেলের পেছনে বসে সমুদ্রের ধার দিয়ে হু হু করে ছুটে যেত। প্রিয় লাল হলুদ ফ্রক। আমসি মুখে নিয়ে। সেবার সমুদ্রে ও আর দাদা  লাফালাফি করছিল। ভরা কোটালের ঢেউ। দাদা বলেছিল কিচ্ছু হবে না! মাথার ওপর জল ঝাপটা মারছে। হঠাৎ দেখে দাদা ঢেউয়ের সঙ্গে চলে যাচ্ছে। অচেনা কে একটা লোক জল থেকে টেনে এনেছিল। পুলি কখন যে এসে ঘুমিয়ে পড়েছে টের পায়নি। বিকেল হয়ে এলো। খাবার গরম করে এক থালাতেই পুলি আর শ্যামলী খেয়ে নেয়। 

বড়ো মেয়ে মাতুকে নিয়ে দাদাদের সঙ্গে খুব সমস্যা চলছে। দাদার সংসারে পেট চালানো যাচ্ছে না । এদিকে বাপ-মা’কে ফোন করলেও রা কাটে না! মাতু লুকিয়ে লুকিয়ে ফোন করে বলে, 

‘এখানে থাকতে পারছি না। খাওয়া নিয়ে কথা শোনায়। খোঁটা দেয়! আমি চলে যাব!’ 

শ্যামলী রেগে যায়। ‘আমার মাথা খেয়ে কোথায় যাবি তুই? লজ্জা করে না? আমি সব বুঝি। ওই ছেলের আমি মাথা ভাঙবো। তোর প্রেম পিরিতি বের করছি।‘

‘না, আমি এখানে থাকব না।‘

‘তা যাবি কোথায় তুই? আমার কথা ভাববি না? তোর বোনের কথা ভাববি না?’ 

‘তুমি কি আমার কথা ভেবেছ? তাহলে তো আমাকে নিয়ে যেতে!’

‘আমি তো বলেছি মাধ্যমিক পাশ কর, তারপর নিয়ে যাব।‘

‘ওসব নিয়ে ভেবো না। আমার জীবন আমি দেখে নেব!’ 

‘তোর বাবা ছেড়ে গেল। সব টাকা নিল। এখন তুইও?’

‘তুমিও ওখানে সংসার করো। বিয়ে করো!’ 

‘আমি তোর মা হই! লজ্জা করছে না?’ 

কিছুদিন শ্যামলী বাড়িতে ফোন করেনি। কাল দুপুরে বাপ ফোন করে জানায় দু’দিন হলো মাতু বাড়ি ফেরেনি। দাদার শ্বশুর বাড়িতে বিয়ে ছিল সেইখান থেকেই মাতু নাকি পালিয়েছে! পড়িমরি শ্যামলী পুলিকে নিয়ে ট্রেন ধরে রাতে বাড়িতে যায়। হাবেভাবে কথায় বোঝে, বাড়িতে তেমন চিন্তা নেই! যেন আপদ বিদায় হয়েছে। বাপমাকে বলে, আর কয়েক মাস রাখতে পারলে না? খেতে পরতে দিতে তোমাদের এত সমস্যা? সুমিতের ঘরে খোঁজ নিয়েছ? তোমরা কি জানতে না এই ছেলেটার পাল্লায় পড়েছিল? আর আমাকে দু’দিন পর জানাচ্ছ! মেয়েটার কথা একবারও ভাবলে না? 

পুলি মায়ের সঙ্গে হাতেহাতে ভাতের হোটেল সামলায়। শ্যামলী এখন আর সামনের ঢেউয়ের দিকে তাকায় না। দূরের সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে থাকে। কলকাতায়  থাকতে পারেনি। পুলি এখানে কলেজে ভর্তি হয়েছে। বলছে উকিল হবে! শ্যামলীর স্বপ্ন। মাতুর খুনিরা শাস্তি পাক। বছরের পর বছর থানা, পার্টি অফিস সব ঘুরেও কিছু হয়নি। যেখানে গেছে সেখানেই টাকা! নোনা জলে মাতুর খাবলানো শরীরটা ভেসে এসেছিল। ওই মাছখেকো পাখিগুলো নাকি মাতুকেও খাচ্ছিল। সুমিতের বাবা পয়সা খরচ করেছে অনেক। এখন সুমিত সরকারি দলের নেতা। বাপি দুবাইতেই মরে গেছে। বাপ-মা মরার পরে দাদাদের সঙ্গেও কোনও সম্পর্ক নেই। 

শ্যামলী বালির ওপর পা চেপে দাঁড়ায়। জলের সঙ্গে বালি সরে যায়। শ্যামলীর ভয় করে না। এগিয়ে যায় ঢেউ পেরিয়ে… অন্ধকার যতই পা চেপে ধরুক জীবনের প্রত্যেকটা ঢেউ নতুন করে বেঁচে থাকা ঠিক শিখিয়ে দেয়। দূরে কুহু সাইকেল চালিয়ে বালি পেরিয়ে যাচ্ছে। শ্যামলী অবাক হয়ে দেখে। এই বালিও একদিন ফুরিয়ে যাবে! সমুদ্র রোজ একটু একটু করে সরে যাচ্ছে। মাছখেকো পাখিগুলো আর মাছ পাবে না। আমাদের ঘরভাঙা স্বপ্নের মতোন…খিদের মতোন! মরা মাছের চোখ নিয়ে শ্যামলী তাকিয়ে থাকে।

# গল্পটি শুভঙ্কর গুহ সম্পাদিত ‘উত্তরপক্ষ’ পত্রিকার বিশেষ গল্প সংখ্যায় (বইমেলা, ২০২৫) প্রকাশিত হয়েছিল। 

সোমনাথ ঘোষাল

সোমনাথ ঘোষালের জন্ম ১০ আগস্ট, ১৯৮২। জন্মস্থান বরানগর, কলকাতা। জীবিকা- লোকগান সংগ্রাহক, কর্ণধার, দ্য আত্মন অডিও। 

প্রকাশিত বই- লেখা সমগ্র (কবিতা ও গদ্য সংগ্রহ), বিরতি গুণছে গতকাল (কাব্যগ্রন্থ),  তেলাপিয়া কথা (কাব্যগ্রন্থ) পাখিদের সমাবেশ (কাব্যগ্রন্থ) দেড়তলা (উপন্যাস), চাঁদ ভাঙা জল( গল্পগ্রন্থ), লাল সুব্বার জ্যাকেট (গল্পগ্রন্থ) ইত্যাদি।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top