‘ভালো নেই’ ও ‘ভালো আছি’র ভিড়ে যে থাকা
ছোট্ট একটা প্রশ্ন! অথচ কতটা গভীর।
জানেন কোনটা?
সেটি হলো, “কেমন আছো?”
একসময় এই প্রশ্নটার ভেতরেই ছিল এক কাপ ধোঁয়া ওঠা চায়ের মতো উষ্ণতা। এখন সেই শব্দটা অনেকটাই আয়নায় দেখা হালকা হাসির মতো— প্রয়োজনীয়, মার্জিত, অথচ দূরের।
কখনও লক্ষ্য করেছেন চেনা মানুষটার ফোনে প্রতিদিন অনেক মেসেজ আসে।
অফিসের গ্রুপ, অফারের নোটিফিকেশন, পুরোনো বন্ধুদের হঠাৎ জেগে ওঠা সৌজন্যবোধ—
সবকিছুর মাঝখানে মাঝেমধ্যে এরকম একটা প্রশ্নও আসে,
“কেমন আছো?”
সে প্রতিবারই একই উত্তর দেয়—
“ভালো।”
এর কারণ এই শহরে “ভালো নেই” বলাটা নির্ঘাত বেনিয়ম। ঠিক ভাঙা ছাতা নিয়ে ঝড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকার মতো। কোনও মানুষই থামে না, শুধু পাশ কাটিয়ে চলে যায়।
এক বয়স্ক কাকুকে আমি চিনতাম। রোজ বিকেলে পার্কের একই বেঞ্চে বসতেন। যে-ই পাশ দিয়ে যেত, হেসে হেসে জিজ্ঞেস করতেন, “কেমন আছো বাবা?”
প্রথম প্রথম মনে হতো, এও বুঝি আর পাঁচটা আনুষ্ঠানিক প্রশ্নের মতোই। পরে বুঝেছিলাম, মানুষটা সত্যিই উত্তর শুনতে চাইতেন। একদিন আমিও মজা করেই বলে ফেললাম,
“ভালো নেই কাকু।”
কাকু কিছুক্ষণ চুপ করেছিলেন।
তারপর ধীরে ধীরে বলেছিলেন, “তা হলে আজ একটু পাশে বসো। মানুষ নিজের খারাপ থাকার কথাও কাউকে বলতে পারে।”
সেদিনের সেই বিকেলের আলোটা অন্যরকম ছিল। ভাবছিলাম, হয়তো এই পৃথিবীতে সম্পর্কগুলো এখনও পুরোপুরি মরে যায়নি।
এখন অনলাইনের যুগে। হাতে হাতে ফোন। পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে কয়েকটা কথা পৌঁছতে কয়েক সেকেন্ডও লাগে না। কখনও হোয়াটস অ্যাপে, কখনও মেসেঞ্জারে “কেমন আছো?” লিখে রিপ্লাই আসার আগেই অফলাইনে চলে যাই। বা উলটো দিকের মানুষটাও উত্তর শোনার জন্যে অপেক্ষায় থাকে না আর।
কারও চোখের নিচের কালো দাগ আর কেউ পড়ে না। অথবা কারও কণ্ঠের ক্লান্তি আর কেউ আলাদা করে শোনে না। তবু মাঝরাতে কিছু মানুষ এখনও ফোনের কনট্যাক্ট লিস্ট খুলে বসে থাকে। অনেক নামের ভিড়ে এমন একজনকে খোঁজে, যাকে সত্যি সত্যি বলা যায়—
“আমি ভালো নেই।”
দীর্ঘ নীরবতার ভিড়ে হাসি ঠাট্টাগুলো কেবল মিইয়ে গেছে। কোভিড চলে গেছে, অথচ সেই দীর্ঘ নীরব থাকা মানুষগুলো আরও বেশি মিশে গেছে অন্ধকারে। যত সব কিছু মুঠোয় এসে গেছে, দূরে চলে গেছে মানুষের অনুভূতি, মানুষের ভালোবাসা। এ ভালোবাসা কোনওদিন ছিল কিনা, সে কথাও আজকাল কেউ বুক চাপড়ে বলতে পারে না। কেবল স্ক্রল হতে থাকে আবেগ।
তবু বার বার জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে হয়, ‘কেমন আছো?’
বৈশাখী নার্গিস
কবিতা কখনও শখ নয়, এ এক জন্ম। প্রতিটা কবিতায় মুহুর্ত নিয়ে বেঁচে থাকার লড়াই। শব্দের শরীরে হু হু করে হাওয়া বাতাস চলাচল না করলে, এই আমি মৃত আত্মা।