thaba.in

কৃশানু বসুর মুক্ত গদ্য

শেয়ার করুন

গাঁজার নৌকা পাহাড় বাইয়া যায়

 

বিশিষ্ট হবার প্রতিযোগিতা চলছে। কেউ কেউ হয়তো বোঝেন, কিন্তু প্রতিযোগীদের বেশিরভাগেরই জানা নেই ‘বিশিষ্টতা’ বলতে ঠিক কী বোঝায়। রাজার বাগানে সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার আয়োজন চলছে সেই পুরাণ মহাকাব্যের সময় থেকেই। তো এই বাগানবাড়ির সংস্কৃতি, শিল্প-সাহিত্যের ধারাটিকে ‘মূল’ ধরে নিয়ে সারা বিশ্বে শুধু সাহিত্য-সংস্কৃতির ‘ইতিহাস’ নয়, তথাকথিত রাজনৈতিক সামাজিক ইতিহাসও রচিত হয়ে থাকে। বলাবাহুল্য, এই ইতিহাসকেই রাষ্ট্রব্যবস্থা স্বীকৃতি দিয়ে থাকে। রাজ-আয়োজন রাজকাহিনির প্রতিযোগিতার বাইরেই অথচ পড়ে থাকে বিস্তারিত আবাদ-ভূমি। মুক্ত চেতনা-বিশ্ব। এই মুক্ত বিশ্বের সৃষ্টিশীলতায় বেশিরভাগ সময়েই কোনো নিয়ন্ত্রণকারীর অনুশাসন থাকে না। শৃঙ্খলার পাশাপাশি বিশৃঙ্খলাও এখানে সমান ক্রিয়াশীল। নানা মত, নানা পথ, নানা ইশারাময় ইঙ্গিতে বয়ে চলা জটিল মুক্ত চৈতন্যময় বিশ্বের স্রষ্টারা কোনোদিনই সেভাবে রাজ অনুগ্রহ, রাষ্ট্রীয় অনুগ্রহের তোয়াক্কাও করেননি। রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রণহীণ সৃষ্টির স্বতঃস্ফূর্ত ধারাটিকে কখনো কখনো অবশ্য রাষ্ট্র তার নিজস্ব প্রয়োজনেই স্বীকৃতি দিয়ে থাকে। বলাবাহুল্য, সে স্বীকৃতির অনেক আগেই সাধারণ লোকজীবনের চৈতন্যজগত আলোড়িত হয় নতুন ভাবনায়, নতুন দর্শনে।

এ সবই পুরোনো কথা।

প্রতিষ্ঠানিক না-প্রাতিষ্ঠানিক বিপ্লব না-বিপ্লব শৃঙ্খলা নৈরাজ্য কাম হিংসা আক্রমণ হ্যাসিস সমকাম বিট জেনারেশান সাদাকালো সিফিলিস র‍্যাবো নকশাল ভোদকা রাম জেনে ভাষা পোস্টমডার্ন ইত্যাদি ইত্যাদি ইত্যাদি ইত্যাদি নিয়ে অনেক আড্ডার এক রাতে আন্ডারগ্রাউন্ড সাহিত্যের প্রসঙ্গটিও এসে যায়। বাংলা সাহিত্যে আন্ডারগ্রাউন্ড ধারা বলে সত্যিই কি তেমন কিছু ছিল বা আছে? তর্ক বিতর্ক চলতেই থাকে। আড্ডা গড়িয়ে চলে যায় রাত পেরিয়ে। মদ ফুরোয়। ফুরিয়ে আসে গাঁজার স্টক। প্রায় শেষদিকে সে আড্ডায় প্রায় অলৌকিক কান্ডের মতো উপস্থিত হয়ে যান আপা বন্দ্যোপাধ্যায়। হাংরি জেনারেশন আন্দোলনের অন্যতম নন, একজন গদ্য লেখক। সাধু বেশে। থমকে যায় ঝিমিয়ে আসা আড্ডা। মিটিমিটি হাসেন আপা। শহরে বুদ্ধির ঝলক নেই সে হাসিতে। তবু কারো কারো গা জ্বলে যেতেই পারে। আপার সঙ্গে কথোপকথনের কিছু অংশ এবার বলা যাক।

রাতের বেলায় এখন আর ঘুমোতেই পারি না। স্বপ্ন দেখবো কেমন করে?

ভীষণ ভয় করে। যদি আবার-

কিসের ভয়

যদি আবার চুরি হয়ে যায়

কী চুরি হবে?

সব জেনে শুনেও তুই ন্যাকামি করছিস। জানিস না আমার হৃৎপিণ্ড, কিডনি, আমার লেখালেখি, বইপত্তর সব চুরি হয়ে গ্যাছে

কে বা কারা চুরি করতে গেল তোমার ওসব

হৃৎপিণ্ড, লিভার আর কিডনিতো সেবারই পুলিশ জোর করে খুলে নিল। তারপর বাড়ির সবাই মিলে আমার সবকিছু চুরি করে বাড়ি থেকে বের করে দিল। এখন আবার চেষ্টা করছে-

কী চেষ্টা করছে?

চোখ দুটো আর বিচি কেটে নেবার। বিচিটাও চলে গেলে আমি বাঁচবো কী করে বলতো?

তোমার বিচি নিয়ে ওরা করবেটা কী?

কেন, বেচে অনেক পয়সা পাবে। বিচি বিক্রি হয় তুই জানিস না? তাছাড়া আমার লেখাগুলো বেচেও তো ওরা অনেক পয়সা করেছে, বাড়ি করেছে। এখন ধান্দা করছে গাড়ির জন্য

এখন আর লেখালেখি কর না

না, করি না

কেন?

ভাল্লাগে না তাই করি না। লিখতেই হবে, পড়তেই হবে এমন কথা যারা বলতে আসবে তাদের মুখে মুতে দেবো আমি। আচ্ছা, তোর কাছে আগে পাইপগান থাকতো না? 

না

কেন আমার কাছে গোপন করে যাচ্ছিস, মাইরি। আমি সব জানি। আমার পাইপগানটা যে কোথায় গেল! কোনো গান্ডুচোদা নিশ্চই গাঁড়ে ঢুকিয়ে লুকিয়ে রেখেছে

গভীর রাতে আপার সঙ্গে কথোপকথনের টুকরো অংশ শুনে যারা মনে করছেন আপার মাথাটা একেবারেই গ্যাছে, তারা কিন্তু অনেকটাই ভুল ভাবছেন।

আপা, আপা বন্দ্যোপাধ্যায়। হাংরি জেনারেশনের সাহিত্য ও লেখালেখি সম্পর্কে যারা এখন নতুন করে খবরাখবর নেবার চেষ্টা করছেন, তারা আরও একটু মনোযোগী হলে হয়তো আপার নামটিও খুঁজে পাবেন। গদ্য লিখতেন আপা। কেমন লিখতেন, কিভাবে দেখতেন জীবনকে, হাংরি-ভাবনাকে কতখানি হৃদয় দিয়ে গ্রহণ করেছিলেন- এসব গবেষণা করবেন গবেষকেরা। আপাতত আপা অন্য অভিযানে। সে অভিযানের কথাই বলার।

সাধু হয়েছেন আপা। সন্ন্যাসী সাজার আইডিয়াটিই আপাতত তাঁর একমাত্র পুঁজি। শুধু আইডিয়া সম্বল করে বেঁচে থাকার যুদ্ধে লড়ছেন আপা। কে বেশি হাংরি, কে প্রবল অ্যাংরি ইত্যাদি তর্কযুদ্ধ, যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা থেকে অনেক অনেক দূরে এখন গেরুয়ায় রাঙিয়ে নিয়েছেন তাঁর একমাত্র পৈতৃক ধূতিটি। ফুলপ্যান্ট-পাজামা ছেড়েছেন, কারণ সাধুতা সে পোষাকে তেমন খোলতাই হয় না। পুরোনো কোনো মন্দির থেকে সম্ভবত চুরি করেই জোগাড় করেছেন জং ধরা একটি ত্রিশূল। সাদাচন্দন-গেরুয়াসিঁদুর চর্চিত কপাল, এক জোড়া ঘন চোখ এবং লম্বা চুল দাড়িতে এক্কেবারে সমীহ জাগানো ঠিকঠাক সাধু। উলঙ্গ স্নানের পর ভোরের গঙ্গাকে চোখ মেরে শুরু হয় তাঁর অভিযান। সাধু চলেছেন বাজার থেকে বাজারে, ঘর থেকে ঘরে।

সাধু সাজার আইডিয়াটা কে দিল? 

কে আবার দেবে। যে কারখানাটাতে কাজ করতাম তারাও তাড়িয়ে দিল। সব করে দিতাম। তবু বলে আমি কিছুই পারি না। মাঝে মাঝে সন্ধেবেলায় ল্যাংটো করে ক্যালাতো। তারপর একদিন একেবারেই তাড়িয়ে দিল। ল্যাংটো করে। আমারও অবশ্য একদম ভালো লাগছিল না। 

তারপর নিজে নিজেই ঠিক করলে সাধু সাজবে

হ্যাঁ, সংস্কৃতটাতো জানতাম। ছোটবেলায় পুজোটুজোও করেছি। এখনো একটু একটু মনে আছে। তুই আরও কয়েকটা সংস্কৃত মন্ত্র শিখিয়ে দিস তো। সুবিধা হবে অনেকটা

কেউ চিনে ফ্যালে না তোমায়

মাঝে মাঝে দু-একজন চ্যাংড়া চিনে ফেলে কাপড় ধরে টানাটানি করে, মজা করে, খিস্তিও করে। দোকানে বসিয়ে খাইয়েও দেয় তারপর। তবে কেউ মারধর আর করে না

কোনো মন্দিরে-টন্দিরে স্থায়ীভাবে বসার কথা ভাবছো না?

গেছিলাম। সবাই আগে থেকেই জায়গা দখল করে নিয়েছে। নতুন কেউ ঢুকতে গেলেই ক্যালাতে আসে। তোর কোনো জানাশোনা আছে?

না, সেভাবে নেই

আছে, কিন্তু বলে দিবি না। যাকগে। মন্দিরের সামনে বসে থাকতে আমারও ভাল্লাগে না। বুড়ো বুড়ো মাগীরা শুধু মুঠো মুঠো সস্তার চাল ছিটিয়ে দিয়ে যায়। বাজারই সব থেকে ভালো। বিশেষ করে মাছের বাজার। নগদানগদি পয়সা দিয়ে দেয়। আলু চাল দিয়ে আমি কী করবো। ওসব তো ফেলে দি। যা পয়সা হয় রাতের বেলায় হোটেলে মাছভাত হয়ে যায়। আমাকে একটা পঞ্জিকা জোগাড় করে দিস তো

পঞ্জিকা কী করবে?

কোথায় কবে মেলা হয় আগে আগেই জানতে পারবো। তাছাড়া একাদশী, পূর্ণিমা, বারবেলা এসব না জানলে এ লাইনে অসুবিধা আছে।

 

# লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল সৌপ্তিক চক্রবর্তী সম্পাদিত ‘প্রতিষেধক’ পত্রিকার পঞ্চম সংখ্যায় (ফেব্রুয়ারি, ২০০৫)। 

কৃশানু বসু

কৃশানু বসুর বসবাস বারানগরে। পড়শোনা যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে। ‘ক্যাকটাস’ নামের নন-প্রসেনিয়াম নাট্যদলের প্রতিষ্ঠাতা। সুদীর্ঘ তিন দশক ধরে লেখালিখি-ফটোগ্রাফি-নাট্যচর্চা ইত্যাদি নানান বিষয়ে আগ্রহী ও নিয়োজিত। তবে আলাদা করে নিজেকে লেখক-নাট্যকর্মী এসব কিছুই না বলে তাঁর সামগ্রিক কর্মকাণ্ডকে বলে থাকেন ‘কালচারাল অ্যাক্টিভিজম’। ঘনিষ্ঠ জুনিয়রমহলে তাদের প্রিয়​ কৃশানু, পরিচিত ‘ভাই-দা’ ডাকে।  

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top