নিরাময়ের রঙবদল
নিরাময় দাড়ি কাটা শুরু করতে না করতেই দেখলো আয়নার গা দিয়ে উপরে উঠে যাচ্ছে এক মাঝারি সাইজের মাকড়শা। মানুষ আসলে অন্যান্য প্রাণমণ্ডল বিচলিত হয়ে পশ্চাদপসরণ করে। প্রায় মাসখানেক পর বাড়ি ফিরে এহেন অপসৃয়মানতা লক্ষ্য করছে টিকটিকি, আরশোলা আর এখন মাকড়শার ভিতর। দেখলেই পালিয়ে যাচ্ছে প্রাণভয়ে। নিরাময় প্রাণীহন্তারক নয়, বরং সহবাসী। তবে তাতে প্রাণমণ্ডলের মানুষের প্রতি ভয়ে কোন হেরফের হয়না। নিরাময় ভাবে, এই ভয় কি কেবল সাইজের? মানে আরশোলা, টিকটিকির কাছে তো ৫ ফুট ৬ ইঞ্চির নিরাময়ও জায়ান্ট। অতিকায় দানব এসে গেছে! নাকি এই ভয় অজানার? এ আবার কে চলে এলো? জানা মুশকিল তবে এটুকু বলা যায়, কেবল মানুষই নিজেকে মানুষ ভাবে। অন্যান্য প্রাণীদের কাছে সে মানুষ নয়, কখনো পিঁপড়ে আবার কখনো ইমারত। জাস্ট অনাদর আনিমাল! আরেকটা মাংসের সং যার শরীরে প্রাণ নাচছে। নিরাময়ের মনে হল মাকড়শাটা ওর চারদিনের কাঁচাপাকা দাড়ি বরাবর উপরে উঠে যাচ্ছে। আয়নায় ওর দোসর হয়ে উঠছে। তবে কি ও আজ সকালে মাকড়শা দিয়ে শেভ করবে?
শেভ করে নিরাময় বারান্দায় এসে দাঁড়ালো। এক মাস আগে যখন বেরিয়েছিল শীত তখন সবে পড়ছে আর আজ একমাস পর শীতের প্রভাব এখন থেকেই ক্ষীণ হয়ে আসছে। গ্রীষ্মপ্রধান দেশে শীত আর কতটুকুই! আসতে না আসতেই সুপর্ণার চলে যাবার সময় হয়ে যায়। পড়ে থাকে কেবল চুল তার কবেকার ইত্যাদি প্রভৃতি…বসন্তের রোদ হলেও সদ্য দাড়ি কাটা মুখে পুড়ে যাবার অনুভূতি হওয়ায় রোদে পিঠ দিয়ে দাঁড়ালো নিরাময়। কাজের দিদির কাছে চাবি দেওয়া থাকলেও খুব একটা বেশিবার আসেনি একমাসে। গাছগুলো জল চাইছে নীরবে। বারান্দার পাশে আরেকটা ছোট ঘর যেখানে ওয়াশিং মেশিন আর কলতলা সেখানে গিয়ে জল ভরতে যাবে, তখনই ওয়াশিং মেশিনের কাভারের ভিতর খসখস করে শব্দ হল। এ আবার কি? সাপ নাকি? হঠাৎ নিরাময়ের মনে পড়ে গেল যাবার দিন তখন উবার চলে এসেছে; বারান্দার পাশের কলতলার ঘরের দরজা বন্ধ করতে যাবে এমন সময় দেখে কিনা ওয়াশিং মেশিনের পাশের ড্রেইনের গর্ত দিয়ে একটা মাঝারি সাইজের গিরগিটি মাথা তুলে তাকাচ্ছে। নিরাময় মনে মনে ভেবেছিল, ব্যাড টাইমিং! এখন এসব হ্যান্ডল করবার সময় নেই। চুপচাপ কলতলার দরজা বন্ধ করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল। কাজের দিদিকে ফোনে বলে দিয়েছিল খেয়াল রাখতে তবে গত একমাসে বাইরে নানা জায়গায় থাকা ও ঘুরে বেরানোর সময় আগন্তুক গিরগিটির কথা মাথা থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল। ভেবেছিল যে পথে এসেছে নিশ্চই সে পথে বেরিয়ে যাবে। সে মক্কেল যে এখনো হস্পিটালিটির আশায় বসে আছে তা কি করে জানবে!
বিগত একমাসে নিরাময় নানা উদ্ভট স্বপ্ন দেখেছে। যেমন বাল্যবন্ধুর সঙ্গে এক কমোডে বসে একইসঙ্গে পায়ুত্যাগের লেটেন্ট হোমোসেক্সুয়াল ড্রিম। তার বন্ধু তার আগে মলত্যাগ করে ক্যাশুয়ালি বেরিয়ে যাচ্ছে। নিরাময় তখনো কমোডে বসে আছে। সে বন্ধুর সঙ্গে দেখা হয়েছে লাস্ট একমাসে হোমটাউন ফেরবার সময়। তবে তাকে এই উৎকট স্বপ্নের কথা বলতে অস্বস্তি পেয়েছে। একসঙ্গে মূত্রত্যাগ অনেক করেছে নিরাময় তা বলে তার সঙ্গে একসঙ্গে মলত্যাগ? ইয়ে বাত কুছ হজম নাহি হুই। এই মুহূর্তে ঐ খসখস শব্দ এবং তার একার বাড়িতে অতিথি গিরগিটির কথা মনে পড়তে কেন জানি না নিরাময়ের মনে হল ঐ স্বপ্নে না থেকেও ছিল অনাহুত অতিথি। ব্যাখ্যা করতে না পারলেও তার মনে হতে লাগলো লাস্ট একমাসে তার আশেপাশে যা কিছু উদ্ভট জিনিস ঘটেছে তার সবকিছুই আসলে ঐ গিরগিটির শরীরজাত। কিন্তু কেন? যুক্তি কি? তা জানে না। কোন ব্যাখ্যা নেই। তাও নিশ্চিত নিরাময়।
যদি গিরগিটি না হয়ে অন্য কিছু হয়? গিরগিটির পথে একটা সাপও তো উঠে আসতে পারে ড্রেইনেজ পাইপ দিয়ে! মুহূর্তেই অবশ্য সে অনিশ্চয়তা মিটে গেল যখন ওয়াশিং মেশিনের পিছন থেকে উঁকি দিতে লাগলো গিরগিটির পো। খুব বড় না আবার নেহাত ছোটও না! নিরাময় তাকে ভয় দেখাল হাত পা নেড়ে, ইঙ্গিত করতে লাগলো পাশের ড্রেইন দিয়ে বেরিয়ে যাবার। মালটা উল্টে দেওয়াল বেয়ে উপরে উঠবার বৃথা চেষ্টা করতে লাগলো, কেন কে জানে? যে পথে এসেছিলি সে পথেই ফিরবি কোথায় ভালোয় ভালোয় তা না! নিরাময় গ্লাসে করে জল ঢালবার চেষ্টা করল ওর গায়ে কিন্তু তাতেও বিশেষ লাভ হল না। ভাবতে লাগলো, গিরগিটিকে কলতলায় আটকে রাখাটা জরুরী। কোন কারণে বেরিয়ে গেলে সারাবাড়ি দৌড়ে বেড়াবে। কোথায় চলে যাবে খুঁজে পাওয়া যাবে না! তারপর রাতে বিছানায় উঠে পড়লে বা সকালবেলা যখন কমোডে বসবে ব্যাটা যদি কমোডের ভেতর থেকে উঁকি মারে? বাল্যবন্ধুর স্বপ্ন কি শেষে গিরগিটি দিয়ে ফলবে নাকি?
নিরাময় কলতলার ঘরের দরজা বন্ধ করে দিল ওকে কয়েদ করবার জন্য। বাইরে বেরিয়ে ভাবল কী করা যায়। গিরগিটি এত ছোটো নয় যে তুলে নিয়ে গিয়ে বাইরে ফেলে দিয়ে আসবে। আর তাছাড়া ধরবে কী করে? গিরগিটি কি কামড়ায়? কামড়ালে কী হবে গুগল বাবাকে জিজ্ঞাসা করতে হবে মনে হচ্ছে। গিরগিটি না রঙ বদলায়? ছোটবেলা থেকে সেই সূত্রেই তো ওর নাম শুনেছে। মানুষ রঙ বদলালেই ঐ তুলনা! নিজের জীবনে গিরগিটির সঙ্গে বিশেষ পালা পড়েনি নিরাময়ের তবে মানুষের রঙ সে কম বদলাতে দেখেনি। ইন ফ্যাক্ট এত বেশি দেখেছে যে ওর দৃঢ় ধারণা গিরগিটি নয় মানুষই রঙ বদলায়! নিরাময়ের অফিস যেতে দেরি হয়ে যাচ্ছে। ফোন করে সিকিওরিটি গার্ডকে ডাকতে না ডাকতেই চলে এল। হাতে মোটাসোটা লাঠি। লাঠির আওয়াজে ভয় পেয়ে গিরগিটি কিছুক্ষণ লাফালাফি করল। গার্ড ওকে ঠিক বাগে না পেয়ে নিরাময়কে জিজ্ঞাসা করল: ‘স্যার মেরে দেবো?’ নিরাময় বলল, ‘নানা, মারার কি দরকার, বার করে দিন না? ঘরের দরজাগুলো বন্ধ করে দিচ্ছি যাতে ঢুকে না পড়ে। কলতলা থেকে বার করে আনুন আগে। তারপর ফ্ল্যাটের দরজা দিয়ে গলা ধাক্কা।’ লাঠির তাড়া খেয়ে গিরগিটি কলতলার ঘর থেকে বেরিয়ে রান্নাঘরে ফ্রিজের পিছনে ঘাপটি মারল। নিরাময় আবার গার্ডকে বলল, মারবার কোন দরকার নেই। সত্যিই মারবার দরকার হল না। লাঠির আওয়াজ আর অনেকক্ষণ ধরে ভয় পেয়ে লাফালাফি করতে করতে গিরগিটি বোধ হয় হার্ট ফেইল করলো। গার্ড বলল, ‘এতো মনে হয় মরে গেছে।’ নিরাময় শুধোলো, ‘কি করে মরল?’ ধুলো ফেলার প্লাস্টিকের যে ডাস্টপ্যান ছিল বাড়িতে তাতে করে বাইরে নিয়ে গিয়ে ফেলে দিয়ে এলো গার্ড। নিরাময়ের মুখে ধন্যবাদটা কেমন অদ্ভুত শোনালো! ডাস্টপ্যানে রক্ত লেগে আছে দেখল নিরাময়। তবে কি লাঠির বাড়িতেই প্রাণ গেল গিরগিটির নাকি বাইরে নিয়ে গিয়ে ডাস্টপ্যান উল্টে ফেলবার সময় গ্রিলে ধাক্কা খেয়ে রক্তপাত? হার্ট ফেইল করলে কি মুখ দিয়ে রক্ত বের হতে পারে গিরগিটির?
কলতলার জলে ডাস্টপ্যানের রক্ত ধুতে ধুতে বিষণ্ণ লাগলো নিরাময়ের। আরশোলা মাকড়শা কাউকেই সে বড় একটা মারতে চায় না। তার মনে হয় এই বাড়ি কেবল তার নয়। কেবল মানুষের নয়। তাও কখনো কখনো এখানে ওখানে মৃতদেহ পেয়েছে আরশোলা মাকড়শার। কীভাবে মরল ঠিক বুঝতে পারেনি। হয়ত অন্য কেউ ওরও একদিন মৃতদেহ খুঁজে পাবে। হয়ত এই বাড়িতেই! হয়ত এই গার্ডই খুঁজে পাবে? মৃত্যু যত নিশ্চিত ততটাই অনিশ্চিত। সে যাই হোক, চোখের সামনে বেশ বড়সড় এক প্রাণী খুন হল, প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষে নিরাময়ই দায়ী তার মৃত্যুর জন্য। রোদের আলোয় কলের জলের নিচে ধুয়ে যাওয়া রক্তের রঙ বদলাতে দেখল। লাল থেকে কমলা হয়ে কালো। গিরগিটির রঙবদল হয়ত এজন্মে আর দেখা হবে না। ডাস্টপ্যানটা কলতলায় রেখে মাথা নিচু করে স্নানঘরের দিকে এগিয়ে গেল নিরাময়। অফিস যেতে আজ দেরি হয়ে গেল। বসকে কি আর গিরগিটির গল্প বললে শুনবে? আজ একমাস পর তার রিজয়েনিং আফটার অল। সে যাই হোক আজ অনেকক্ষণ ধরে স্নান করবে নিরাময়। অনেকটা জল আর অনেকটা সাবান লাগবে ওর।
অর্ক চট্টোপাধ্যায়
অর্ক চট্টোপাধ্যায় পশ্চিমবঙ্গের শূন্য দশকের কথাসাহিত্যিক। পেশায় অধ্যাপক। পশ্চিমবঙ্গের হুগলী জেলার উত্তরপাড়ার স্থায়ী বাসিন্দা। আই,আই,টি গান্ধীনগরের মানববিদ্যা বিভাগে সাহিত্য এবং দর্শন পড়ান। পেশাসূত্রে বসবাস করেন গুজরাতের গান্ধীনগরে। সম্পাদনা করেছেন ‘অ্যাশট্রে’ পত্রিকা। প্রকাশিত গ্রন্থ: ‘পিং পং গন্ধ’ (গল্প সংকলন, ২০০৯), ‘অলিখিত হ্রস্বস্বরের সন্ধানে’ (গল্প সংকলন, ২০১৫), ‘উপন্যস্ত’ (উপন্যাস, ২০১৮), ‘আতসবাজি ছায়াপথে ফিরে যাও’ (গল্প সংকলন, ২০২১)।