নির্লিপ্তি একটা কন্ডিশন
রাজর্ষি চট্টোপাধ্যায়ের প্রশ্নের উত্তরে
রাজর্ষি: কবিতা নির্মাণ না সৃষ্টি?
শুভঙ্কর: দুটোই। আবার কোনোটাই নয়। কবিতার একটা টেকনিক্যাল দিক আছেই। যদিও শুধু টেকনিক দিয়ে যে কবিতার সার্কাস আজ বাংলাবাজারে ছড়াছড়ি এতে আমার বিশ্বাস নেই। নাক অবধি বর্ম টেনে যে যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা, ওতে বহোত বিপ্লব হয়ে গেলেও যেতে পারে, কিন্তু ওখানে কবিতাটা নেই। কবিতাটা ভিতর থেকে আসার ব্যাপার। একটা অনায়াস পদ্ধতি হয়তো। একটা নির্লিপ্তি কী? কে জানে। তাই নির্মাণও নয় সৃষ্টিও নয়, কবিতাটা আমার কাছে নির্বাণ।
কবিতায় মেটাফর বাদ দেওয়া, ‘মতো’ বাদ দেওয়া, প্যাশন বাদ দেওয়া, ছন্দ বাদ দেওয়া, এসব প্রচুর হয়েছে। আমিও এই পথটা পেরিয়ে এসেছি। এসে এখন মনে হচ্ছে কবিতাটা স্পিক ইজি হোক। গয়না, বর্ম, আড়াল ফেলে দিয়ে কবি উলঙ্গ হয়ে দাঁড়াক। না পালিয়ে জীবনের মুখোমুখি নিজের কথা বলুক। একে সৃষ্টি বললে মুশকিল। সৃষ্টির মতো কিছু একটা হয়তো, খাদের ধারে দাঁড়িয়ে শরীরের রিনরিন করার অভিজ্ঞতা শুধু।
রাজর্ষি: কবির আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক সচেতনতার কোনো প্রয়োজন আছে?
শুভঙ্কর: থাকা উচিত। সে তো একজন সাধারণ মানুষই। বাজারে তাকে রোজ আলু, চাল, ডাল কিনতে হয়। সবজিওলার সাথে ঝগড়া করতে হয়। লঙ্কার দাম বাড়লে পাত থেকে সেটা বাদ দিতে হয়। আমার কাছে এটুকুই সচেতনতা। কোনো রাজনৈতিক আলোকবর্তিকা আর পথ দেখাবার জন্য পড়ে নেই। সবই ধান্দাবাজিতে পর্যবসিত। এর ভেতর স্বাধীন থাকার চেষ্টা করাটাই সচেতনতা। তেল না মারার তেলের বাটি নিয়ে না ঘোরার অবস্থানটুকু। একটা ব্যক্তিগত রেজিস্টেন্স। ওয়াল্টার বেঞ্জামিনকে এক্ষেত্রে মনে করা যেতে পারে। মানে FTV নিয়ে আমি কখন খেলব সকালে, না বিকেলে, না রাতে একা একা সেটা আমিই ঠিক করব, আদৌ খেলব কি না তাও। এই সমাজে আমিও নিতান্তই এক জন কনজিউমার। তুমি আমাকে লোভ দেখাতে পারো কিন্তু আমার ইচ্ছের অধিকার তোমার নেই। এটুকুই আমার ব্যক্তিগত রেজিস্টেন্স এই সমাজের প্রতি যখন সো-কল্ড প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা, পোস্টমডার্নিজম সবই ইনকর্পোরেটেড।
রাজর্ষি: কবি কি নিজেকে একজন সাংস্কৃতিক কর্মী ভাববেন?
শুভঙ্কর: আমি ভাবি না, কিন্তু কেউ ভাবলে তাকে বকতেও যাব না।
রাজর্ষি: যেকোনো স্কুলিংই কবিতার জন্য কতটা পুষ্টিকর বা ক্ষতিকর?
শুভঙ্কর: যেকোনো স্কুলিং, গুরুকুলই খারাপ। ওতে গুরুদের উপকার হতে পারে ছাত্রদের নয়। এখন বাঙালি তো, বাবা ছাড়া কি এদের চলবে!!
রাজর্ষি: শুভঙ্কর দাশ বা কবিতা ক্যাম্পাস শুভঙ্কর দাশ বা গ্রাফিত্তি
শুভঙ্কর: কবিতা ক্যাম্পাস বা গ্রাফিত্তি দুটোই তো এখন ইতিহাস।
আর পুরোনো কাসুন্দি হাংরিদের মতো ঘাঁটাঘাঁটি, গালাগালি আমার না পসন্দ। এটা পাঠক করুক। মানে যার দরকার আছে আর কী।
আমার কোনো দায় নেই।
আমি তো বেঁচে আছি এখনও। ইন্ডিভিজুয়ালি। অলোক ক্যাম্পাস চালায় এখন। দল ভেঙে একা। এখনও লেখা চাইলে লেখা দিই। গ্রাফিত্তির কোনো কাগজ নেই আর। ইংরেজিতে আছে অবশ্য। Grafitti Kolkata, বছরে দু-বার বেরোয় এই আন্তর্জাতিক কাগজটি। মাঝে Grafitti Kolkata Broadside মাসে মাসে বেরোত। পয়সার অভাবে ওটা বন্ধ হয়ে গেছে। মানে দলবল নিয়ে নয় আপাতত একা কাজ করতে চাইছি। আর বইটই এখনও বেরোচ্ছে টুকটাক। নজর রাখুন।
রাজর্ষি: শুভঙ্কর দাশ প্রথম থেকেই অনন্য, তাঁর জীবনযাপন ও কবিতাকর্ম প্রায় সমার্থক হয়ে আছে- কীভাবে সম্ভব?
শুভঙ্কর: গ্রাফিত্তি মানে আমাদের বেঁচে থাকার ভালোবাসার পদ্ধতি। এটা গ্রাফিত্তির বহু ব্যবহৃত একটা পুরোনো লাইন।
একটা জোকার দড়ির উপর দিয়ে হাঁটছে। সবাই ভাবছে মালটা কখন পড়বে। এখন ব্যাপারটা হল আপনি কি পাবলিককে খুশি করতে ইচ্ছে করে স্লিপ করবেন!! মানে করতেই পারেন বাধা নেই। অথচ আপনি বেমালুম অন্য দিকে চলে যেতেও পারেন। তাতে পাবলিক খচে গেলেও আপনার জাস্ট কিস্যু করার নেই। স্লিপ করার ধর্ম যদি আপনার না থাকে। মানে লেখালিখি আর জীবনযাপন আমার কাছে কখনোই আলাদা ছিল না। এখনও নেই। মানে ব্যাপারটা ক্রেডিটের নাও হতে পারে, অন্তত সমাজের চোখে তো নয়ই। কিন্তু আমি স্ট্রিট পোয়েট থাকতে আরাম পাই, মোর comfortable ফিল করি। কী আর করা যাবে। তবে এসব করে টরেও বিনি পয়সায় বিদেশ ঘোরা টোরা, কবিতা পড়া সম্ভব। এমনকী ক্রিটের দামি রেড ওয়াইন জিভে রোল করাও। হাঃ হাঃ হা-হা-হা, হৌ হৌ হৌ।
রাজর্ষি: কবিতা ও নির্লিপ্তি
শুভঙ্কর: নির্লিপ্তি একটা কন্ডিশন। কবিতা লিখতে সাহায্য করে খুব। আমাদের এশিয়ান কান্নাকাটি, সেল্ফ পিটি, আবেগের সমুদ্রে খানিকটা ব্যারিকেড দিতে সাহায্য করে। তাও হয় না। শালা জাতে বাঙালি। ভেতো। দুপুরে ঘুম ছাড়া মেজাজ খিটখিটে। চল্লিশের পর দাঁড়ায় না। তাদের কী করে বোঝানো যাবে ‘ইউ ক্যান জগ ইয়োর টিয়ার্স অ্যাওয়ে’। বেসিক কালার্স-এ আটকে পড়া, তীব্র তেলঝালটক ছাড়া যাদের জিভে সাড় নেই তাদের হাইকু বোঝানো খুব কঠিন। বুদ্ধ ধর্ম তাই এখানে ঠাঁই পায় না। তাকে জাপানে আশ্রয় নিতে হয়। সেখানে নির্লিপ্তি একটা খুব বড়ো ব্যাপার। যদিও ওটা আমরাই পৃথিবীকে শিখিয়েছি। এটা কি একটু বাড়াবাড়ি হয়ে গেল? হোক গে। ইতিহাস খুললে দেখা যাবে ভারতই একমাত্র দেশ যে কাউকে আক্রমণ করে নিজের বীর্য প্রমাণ করতে যায়নি। তাই শান্তি, ভালোবাসা, নির্লিপ্তি ওটা আমাদের বিষয়। নাগার্জুনও। মূলমধ্যমককারিকাও। জীবনানন্দকে-
‘সরোজিনী এইখানে শুয়ে ছিল
জানি না সে এইখানে শুয়ে ছিল কি না’
লিখতে দেরিদা পড়তে হয়নি।
রাজর্ষি: কবিতায় ডিপার্চার
শুভঙ্কর: আমি তো কখনোই সো-কল্ড ফিতে মেপে কবিতা লিখতে চাইনি তাই আমার কাছে তো সবটাই ডিপার্চার।
রাজর্ষি: শুভঙ্কর দাশ ও ফরেন কানেকশান
শুভঙ্কর: ইংরেজি ভাষাটা আমি জানি না। বাংলাটাও জানি না তবে ইংরেজিটা তার থেকেও খারাপ জানি। শিখতে শিখতে লিখছি। লিখতে লিখতে শিখছি। প্রচুর কবিতা ইংরেজি থেকে গ্রিক, ইতালিয়ান, সুইডিস, রোমানিয়ান ভাষায় অনুবাদ হয়েছে। হচ্ছে। ফ্রেঞ্চে এই মুহূর্তে কাজ চলছে। আমেরিকা থেকে ইংরেজিতে তিনটে কবিতার বই বেরিয়েছে। বিভিন্ন কবিতার সংকলনে প্রকাশিত হয়েছে। আমেরিকার বিভিন্ন Poetry Festival-এ আমার কবিতা লোকজন পড়েছে। অ্যাপ্রিশিয়েট করেছে। তার সবটা আমি জানিও না। আজই ফেসবুকে একজন অস্টিনবাসী ভদ্রমহিলা সে কথা আমাকে জানালেন যে তিনি আমার কবিতা Austin Poetry Festival-এ পড়েছেন। সেদিক থেকে দেখলে মেয়েরা আমাকে ভালোইবাসে। আমিও পছন্দ করি তাদের। এদিক থেকে আমার ভারতীয় প্যানপ্যানানি কাজ করে না।
এছাড়াও South Africa, US, UK, Sweden, Italy, Greece ইত্যাদি বহু দেশের ই-কাগজ আর প্রিন্ট ম্যাগাজিনে লিখেছি, লিখছি। এই তো সেদিন আমেরিকার একটা Microzine edit করলাম। Durable Goods। তোরও তো লেখা সেখানে ছিল। বলা বাহুল্য I Started with you baby.
রাজর্ষি: আবার প্রথম থেকে লিখতে শুরু করলে কী লিখবে/কী লিখবে না…
শুভঙ্কর: এখনও ভাবিনি, তবে বয়সটা কমে গেলে কিন্তু মেন্টাল স্ট্রাকচার এখন যা তাই থাকলে ফাটিয়ে দিতুম শালা। ডাক্তার যতই বলুক act your age কিন্তু আমি তো ৩৫-এর পর কাউন্ট করতেই ভুলে গেছি তাই আমার অসুবিধে নেই। একটা সাদা পাতা সামনে থাকলে আমি নতুন করেই শুরু করি। ওটা একটা orgasm-এর মতো একটা floating existence। যখন ব্যক্তি আমি কে তা মনে থাকে না। জাস্ট একটা ভালো লাগা শুধু। সপ্তম চক্রের হোয়াইট লাইট।
রাজর্ষি: শুভঙ্কর দাশ on শুভঙ্কর দাশ
শুভঙ্কর: সে তো সেই বিশ-পঁচিশ বছর আগে বলে দিয়েছিলাম- শুভঙ্কর বা না শুভঙ্কর- কিসসু এসে যায় না।
# এই সাক্ষাৎকারটি সংযোজিত হয়েছিল গ্রাফিত্তি থেকে প্রকাশিত শুভঙ্কর দাশের ‘একা শহর ও অন্যান্য’ (২০২১) কাব্যগ্রন্থে।
শুভঙ্কর দাশ
শুভঙ্কর দাশ (১৩ই মার্চ, ১৯৬৩ – ২২শে মে, ২০২৪) ছিলেন একজন ভারতীয় কবি, অনুবাদক, লেখক, সম্পাদক ও প্রকাশক। কলকাতা শহরে আজীবন স্বাধীন ভাবে লেখালিখিতে নিয়োজিত ছিলেন। বাংলা ও ইংরেজি দুটো ভাষাতেই কবিতা লিখেছেন। ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম কবিতার বই ‘বিকৃত মস্তিষ্কের গান’। কবিতা ও গদ্য মিলিয়ে প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা তিরিশের ওপর।
আমেরিকা থেকে ইংরেজিতে তিনটে কবিতার বই প্রকাশিত হয়েছে এবং সমসাময়িক বিভিন্ন আমেরিকান কবিতা সংকলনে সংকলিত হয়েছে তাঁর কবিতা। বেশ কিছু কবিতা ইংরেজি থেকে অনুদিত হয়েছে গ্রিক, ইতালিয়ান, সুইডিশ ও রোমানিয়ান ভাষায়।
ইংরেজি থেকে অনুবাদ করেছেন চার্লস বুকাওস্কি, রিচার্ড ব্রটিগান, অ্যালেন গিনসবার্গ, জ্যাক মিশেলিন, স্টিভ রিচমন্ড সহ আরও অনেক আমেরিকান কবি-লেখকের কবিতা, ছোট গল্প, জার্নাল, সাক্ষাৎকার ও উপন্যাস।
আশির দশকের শেষ ভাগে শুরু করেন ‘গ্রাফিত্তি’ নামক প্রকশনা ও পরবর্তীতে একই নামে ছোট পত্রিকা। আমৃত্যু সম্পাদনা করেছেন গ্রাফিত্তি পত্রিকা ও গ্রাফিত্তি প্রকশনা থেকে প্রকাশ করেছেন মূলধারার বাইরের কবি-লেখকদের বই ও অনুদিত বই।
ইয়োরোপে ছড়িয়ে থাকা কবি-লেখক-চিত্রকর বন্ধু-বান্ধবীদের আমন্ত্রণে কবিতাপাঠ, সাক্ষাৎ ও আড্ডার উদ্দেশ্যে গ্রিস, সুইডেন, ইতালি ইত্যাদি দেশে মাস খানেকের সফর করেন ২০১০ নাগাদ। এই সফর নিয়ে তাঁর বই ‘ইয়োরোপের দিনগুলো’ প্রকাশিত হয় তাঁর মৃত্যুর পর। প্রকাশক: হপ্তাক কাচরা।
লেখেলিখি ও সম্পাদনার কাজ করতে করতেই আকস্মিক প্রয়াণ ঘটে তাঁর।
আজও কলকাতা বইমেলা কিংবা লিটল ম্যাগাজিন মেলায় ‘গ্রাফিত্তি’ ও ‘হপ্তাক কাচরা’র টেবিলে টের পাওয়া যায় তাঁর জলজ্যান্ত উপস্থিতি।
উল্লেখযোগ্য কিছু বইঃ By the Banks of the Ajoy, Jaideb Vanishes into the Blue (Poems, ISBN 978-110534-133-5, Virgogray Press, USA, 2011), শুভঙ্কর দাশের কবিতা (কবিতা, প্রতিশিল্প, বাংলাদেশ, ২০১১), Thieves of the Wind (Poems, with Catfish McDaris, ISBN 978-1-49967-033-2, Writing Knights Press, USA, 2014), 66 lines On Your Soul (Poems, with Catfish McDaris & Kevin Ridgeway, Graffiti, 2014), Bukowski Smoked Bidis (Poems, Grandma Moses Press, USA, 2015), একা শহর ও অন্যান্য (কবিতা, গ্রাফিত্তি, ২০২১), ছায়া-সিদ্ধার্থ (গদ্য, গ্রাফিত্তি, ২০২৩), ফক্কড়নামা (কবিতা ও গদ্য, হপ্তাক কাচরা, ২০২৩) ইত্যাদি।
রাজার্ষি চট্টোপাধ্যায়
জন্ম: ৭ই মে, ১৯৭০। স্থান: বরানগর, কলকাতা। প্রকাশিত গ্রন্থ: নাবিক জন্মের ভবিষ্য (কাব্যগ্রন্থ, ১৯৯৮), জগৎকারুসভা (কাব্যগ্রন্থ, ২০০৫), পিগিকলোনি (কাব্যগ্রন্থ, ২০১০), প্রিয় কার্ডিগান (কাব্যগ্রন্থ, ২০২১), রমলাকান্তের উট (গদ্যগ্রন্থ, ২০০৭), রমলাকান্তের উট ও অন্যান্য (গদ্যগ্রন্থ, ২০১২), কথাপুরুষম (গদ্যগ্রন্থ, ২০১৬), গদ্য গল্প সংগ্রহ -১ (২০২১), ঋতবীণা (উপন্যাস, ২০১৪) এবং Poppy Field and Scarlet Flowers (English Anthology, 2018)। সম্পাদিত পত্রিকাঃ খামার, রেফ, জার্নি ৯০ ও ৯’য়াদশক। গবেষণাধর্মী কাজ: কবিতা থেকে কৃত্তিবাস থেকে কৌরব – বাংলা কবিতায় নতুনের সন্ধান (Junior fellowship, Indian Ministry of Culture)।