thaba.in

রাজর্ষি চট্টোপাধ্যায়ের দীর্ঘ কবিতা

শেয়ার করুন

নাবিক জন্মের ভবিষ্য – ২

 

(I don’t write poetry, I even don’t pretend to write)



এইসব জীবনের কাছে            অর্থহীন

অথচ, এত সাংকেতিক কারুকার্যে লীন

যে বিশদে বসে আছে       ছুটে নিয়ে যায়

আপাত শান্ত এক ক্লান্তিনাশা প্রান্ত সন্ধ্যায়…

 

পরিমিত সারল্য, সৌজন্যহেতু নীতিজ্ঞান, সংসারের নিক্তি হাতে মাপা 

চাপা কান্না রাগ হাসি দুঃখ অনুরাগ 

সব বুড়ো নিমের গোড়ায় ঢেলে দিয়ে 

সব প্রেম আর পতাকা থেকে নামের আদ্যক্ষর তুলে নিয়ে 

মাটির ঢের নিচে পোকাদের চলন আর বলনের

প্রকৌশল থেকে 

কীভাবে আদিতম চাষির সাফল্যের ইতিহাস আরো একবার লিখে ফেলা যায়

সে দিশায় আমাকে ছেড়ে যাচ্ছে পুরনো তোরঙ্গ

তোরঙ্গের ভেতরে পুরনো দেশ দৈশিকতা

লুঠ হয়ে যাওয়া নাম, ছাড়ছে না কিছুই 

স্টেশন সরণি পুরনো স্থাপত্য সব 

শুধু যে আর্মানি ঘাটের পুরনো তক্তা কাঠে 

ঘুন ধরেছে তা নয় 

আলজিব থেকে গুটি গুটি নেমে গেছে 

অন্ত্র পর্যন্ত এক বিচিত্র ক্ষয়ের সমাহার 

ঈশ্বরী জানে শিশ্ন এখনো শান্ত নয় 

তবুও নিম গাছে বাদুর ঝোলে, পাক খায় 

খেতে খেতে দেখে ঘাত আর ঘাতকের মুখোশ 

কীভাবে দ্রুত বদলে যায়, জনগণমন 

আর কোন অধিনায়ক নেই আমাদের

 

শুধু এইসব নেতিদেশ আর নেতি নাম…

 

এর থেকে ঢের ভালো ভাসি যা…

ভুলই তো সব, ভুলের রাস্তা ধরে উৎখাত হয়ে যাওয়া বাড়িঘরদোর 

পাটনির দোকান, এখনো গিলে করা সেউতির খোঁজে বিদেশি বনিক আসে 

আসে রক্তের গাড়তা কমাতে ইকোস্প্রিন

মাথার ভেতর অনবরত অন্ধকার আসে

একটা টিমটিমে আলো নাবিকের আর কোন ভবিষ্য জন্মের দিকে যদি জ্বলে থাকে 

 

মিথ্যে মিথ্যে সব, উত্তর সত্যিয় কালে

রেইনবো পতাকা নিয়ে সব ছুটে চলে

আয়ত্তের অধীনে নেই আর স্থিতিজাড্যের সব সম্পর্ক 

এখন সিচুয়েশনশিপ, সুঠাম আঙুলগুলো ঝরে গেলে 

পঙ্গুর হাত ধরে পঙ্গু আরেক নিয়ে যায়

ঝলমলে আউট্রামঘাট, পিস্তাচিও আর ক্যারামেল মিশে গিয়ে বাস্কিন রবিনস

শান্ত গভীর নিশীথের সংহতি নেই আর 

 

রেড রোড থেকে হরিণীরা ফিরে গেছে বহুদিন 

 

তাই পালানোর থেকে আর পালানোর কিছু নেই, 

এই খালাসীর 

কোন বাঁও মেলে না অথচ অগভীর এই জলে জঙ্গলের হাতায়

জ্যোৎস্নাও ডোবে না এমন পায়ের পাতায় সৌখিন উল্কি সব আর যত বুনো নথ ফুটে আছে

যোনি থেকে নাভি থেকে স্তনবৃন্ত থেকে ওষ্ঠ থেকে 

ভ্রূপল্লবিত ব্যক্তি মানুষীর ঘেঁটে যাওয়া দলিল দস্তাবেজ 

ব্যক্তি মানুষ, বুকে ধরে রাখা চেগেভারা, থেকে অবলোকিতেশ্বর হয়ে চালিশার হনুমান,

তার হাত থেকে নিস্তার নেই আজও 

অথবা, তদ্বিপরীত

 

সমস্ত শিবির ছেড়ে কোথায় হারিয়ে গেছে আমাদের  ত্রাণ

 

মনে পড়ছে থলকোবাদ

জুলাই, ২০২৫

 

একমাত্র গাছেরা জানে 

কারা দোনলা বন্দুক নিয়ে এসেছিল 

 

উড়িয়ে দিয়েছিল এই গেস্টহাউস 

 

তারা জানতো না আজ তার মাথার উপর 

এক কর্পোরেট রেস্টহাউস বসে আছে 

 

আমার ঘুম আসছে না 

আমার ঘুমের কাছে হাঁটু মুড়ে বসে আছে 

আমার ছেলেবেলা

 

মা আসলে এক পান্থজন 

কে আসবে, যাবে কে

 

আজ যে বৃদ্ধাকে দেখলাম

লড়াইয়ের মোরগ হাতে গাছেদের দিকে মুখ তুলে

অস্ফুট কীসব বলতে বলতে

বধ্যভূমির দিকে চলে যাচ্ছে

সে’ও পারেনি তার ছেলেকে ফিরিয়ে আনতে 

 

সেখান থেকে

 

এসবই দু চার কথা, গাছেরা মানুষ সম্পর্কে জানে

 

অথচ, গাছেদের মহাকাব্য আমাদের মহাকাব্য নয়

প্রত্যেকেই বংশ তালিকা হাতে বসে আছে 

যে যার নিজস্ব মহাকাব্যের অংশ হবে বলে

 

তোমাকে চলে যেতে হবে দূরতর দূরে

এইসব স্বরচিত মৃত্যু যা প্রতিদিন লিখি

 

আজ এখন একটানা বৃষ্টি প্রমান মাপের 

কাচের গা বেয়ে নেমে যাচ্ছে

কাচের এপারে যে, দৃশ্য ধুয়ে মুছে তার যেভাবে সাফ হয়ে যাচ্ছে, ওপারের কাছে ঠিক সেভাবে নয়

 

আমার এপারই ভাল লাগে এখন

ওপার ভাল লাগত কোন এক তখন চোখের গভীর বলতে অনাক্ষরিক দামিনীর শরীরের নাব্যতা  

সেখানে শ্রাব্য ও দৃশ্যের অফুরান জন্ম ও মৃত্যু 

 

এপারে এখন নৈঃশব্দ ও নৈঃদৃশ্য দীর্ঘস্থায়ী হতে থাকে

 

একটানা আর কী হতে পারে ভাবতে বসে মনে হল ক্রনিক মেলানকলি এন্ড ইনসেসেন্ট রেইন

গো সো ফাকিং হ্যান্ড ইন হ্যান্ড

জাস্ট লাইক মেন-হোর

 

একটানা বৃষ্টির মত 

                          শব্দ ও দৃশ্যের মত

                                                   ব্যাধির মত 

ক্রমাগত আমাকে দূরে নিয়ে গিয়ে ফেলছে

কুসুম সূর্যের থেকে 

 

এক আত্মহনন প্রবণতার মধ্যে সে ঝাঁপ দিচ্ছে

দিঘীজলে

সেখানে সফল এক ব্যর্থতার পুরানকথা লিখে রাখা                                                    

সেইসব গাছেদের বাড়ি, অলৌকিক

সেই সব পিতামহ গাছ

 

তাদের পাতায় পাতায

রাজর্ষি চট্টোপাধ্যায়

জন্ম: ৭ই মে, ১৯৭০। স্থান: বরানগর, কলকাতা। প্রকাশিত গ্রন্থ: নাবিক জন্মের ভবিষ্য (কাব্যগ্রন্থ, ১৯৯৮), জগৎকারুসভা (কাব্যগ্রন্থ, ২০০৫), পিগিকলোনি (কাব্যগ্রন্থ, ২০১০), প্রিয় কার্ডিগান (কাব্যগ্রন্থ, ২০২১), রমলাকান্তের উট (গদ্যগ্রন্থ, ২০০৭), রমলাকান্তের উট ও অন্যান্য (গদ্যগ্রন্থ, ২০১২), কথাপুরুষম (গদ্যগ্রন্থ, ২০১৬), গদ্য গল্প সংগ্রহ -১ (২০২১), ঋতবীণা (উপন্যাস, ২০১৪) এবং Poppy Field and Scarlet Flowers (English Anthology, 2018)। সম্পাদিত পত্রিকাঃ খামার, রেফ, জার্নি ৯০ ও ৯’য়াদশক। গবেষণাধর্মী কাজ: কবিতা থেকে কৃত্তিবাস থেকে কৌরব – বাংলা কবিতায় নতুনের সন্ধান (Junior fellowship, Indian Ministry of Culture)।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top